রক্তের বন্ধন যুব সংগঠন তুচ্ছ নয় রক্তদান বাঁচতে পারে একটি প্রান

ইসলাম ধর্ম

নেক্কার স্ত্রীর গুনবলি

0

নেক্কার স্ত্রীর গুনবলি

মহান রাব্বুল আলামীন হজরত আদম আ. কে সৃষ্টি করার পর নিঃসঙ্গতা দূর করা এবং মানব সৃষ্টির ক্রমধারা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে হজরত হাওয়া আ. কে সৃষ্টি করেছিলেন। কেননা, পুরুষ ও মহিলা একে অপরের পরিপূরক। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর বাণী, ‘তারা তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ’ -(সুরা আল বাক্বারা ঃ ১৮৭)। নারী-পুরুষকে আল্লাহ তা’আলা পারষ্পরিক সম্প্রীতি ভালবাসার মাধ্যমে একাকার করে দিয়েছেন। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সীমাহীন মহব্বত সৃষ্টি করে প্রশান্তির নিদর্শনের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। যা আল্লাহ পাকের বাণীর মাধ্যমে প্রতীয়মান হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘আর এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গীনীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাক এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারষ্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে’-(সুরা আর রূম ঃ ২১)। আর ঐ সব স্ত্রীদের কাছেই প্রশান্তি যারা স্বতী-সাধ্বী এবং আদর্শবান। হাদীস শরীফের ভাষায়, ‘হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আ’স রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, সমগ্র পৃথিবীর মানুষের ভোগ্য বস্তু, এর এর মধ্যে সর্বোত্তম হলো পূণ্যবতী স্ত্রী’ -(নাসায়ী ঃ ৩২৩২)।
একজন আদর্শ স্ত্রীর যে সকল গুণাবলী তাকে সুশোভিত করে তোলে তার কতিপয় আলোকপাত করছি। প্রকাশ্য বা গোপনে সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহ তা’আলা এবং তদীয় রাসুল রাহমাতাল্লিল আলামীন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুসরণ ও অনুকরণ করবেন। তাদের বিরুদ্ধাচরন কখনই করবেন না। তিনি নিজেকে স্বামীর অবর্তমানে সর্বাবস্থায় সংরক্ষণ ও সংবরণ করবেন। হাদীস শরীফের ভাষ্যমতে, ‘হজরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, আমি কি তোমাকে মানুষের সর্বোত্তম সম্পদ সম্পর্কে অবহিত করবো না? তা হলো, নেককার স্ত্রী। সে তার দিকে তাকালে সে তাকে আনন্দ দেয় এবং তাকে কোন নির্দেশ দিলে সে তা মেনে নেয় এবং সে যখন তার থেকে অনুপস্থিত থাকে, তখন সে তার সতীত্ব ও তার সম্পদের হেফাজত করে’ -(আবু দাউদ ঃ ১৬৬৪)।
তিনি স্বামীর অনুমতি ব্যতিরেখে বাড়ীর বাইরে বের হবেন না। তার আদেশ নির্দেশ মেনে চলবেন। তার প্রতি সর্বদা সম্মান ও ভালবাসা প্রদর্শন করবেন। কেননা, স্বামী তার কাছে সর্বদা সম্মানের পাত্র। হাদীস শরীফে এসেছে, ‘হজরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, আমি যদি কাউকে অন্য লোকের প্রতি সেজদা করার নির্দেশ দিতাম তাহলে অবশ্যই স্ত্রীকে তার স্বামীর প্রতি সেজদা করার নির্দেশ দিতাম’ -(তিরমিজি ঃ ১১৫৯, ইবনে মাজাহ ঃ ১৮৫৩)। স্বামী স্ত্রীকে সর্বাবস্থায় মুচকি হাসিতে দেখতে পছন্দ করেন। সেজন্য, স্ত্রীর উচিৎ হাস্বোজ্জল করে থাকা। ঘোমরা মুখ না করে মুচকি হেসে স্বামীকে বরণ করার মাধ্যমে আদর্শ স্ত্রীর আদর্শতা প্রকাশ পায়। মহান আল্লাহ পাকের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার পাশাপাশি তিনি স্বামীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কারীনী হবেন।
স্ত্রী উত্তম চরিত্রের অধিকারীনী হবেন। ঝগড়া-বিবাদের সময় কখনও স্বামীর আওয়াজের উচ্চ আওয়াজে কথা না বলা আদর্শ স্ত্রীর বিশেষ গুণ। স্বামী দরিদ্র হলেও তাঁর দরিদ্রতার উপর ধৈর্য্য ধারণ করা এবং সম্পদশালী হলে তার সম্পদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। সর্বদা স্বামীর কল্যাণে প্রচেষ্ঠা ও কল্যাণকে পছন্দ করা এবং স্বামীর কল্যাণকে প্রকাশের প্রচেষ্ঠা করা। সত্য কথা বলার মাধ্যমে নিজেকে সুশোভিত করা এবং সর্বপর্যায়ে মিথ্যা বলা বা মিথ্যার উপর আশ্রয় নেয়া হতে বিরত থাকা আদর্শ রমণীর সর্বোত্তম গুণ। অন্যকে তিরষ্কার এবং ঠাট্রা, বিদ্রæপ থেকে সর্বদা বিরত থাকা। আদর্শ স্ত্রী হবেন ন¤্র, ভদ্র। অহংকার, গর্ব ও অহমিকা হতে সবসময় নিজেকে দূরে রাখবেন। আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত করা ফরজসমূহ পূর্ণাঙ্গরুপে আদায় করবেন। আদর্শ স্ত্রীর জেনে রাখা উচিৎ যে, তার স্বামী তার সর্দার বা নেতা, যিনি তাকে পরিচালনা করবেন। আদর্শ স্ত্রীর আরো জেনে রাখা উচিৎ যে, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর অধিকার ও কর্তব্য প্রচুর এবং মহৎ কিন্তু এটাও জানা উচিৎ তার চেয়ে বেশি অধিকার ও কর্তব্য স্ত্রীর স্বামীর এবং সেগুলো সুমহান। তিনি কখনো নিজের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য আহŸান করলে সাথে সাথে সাড়া দেয়া একজন আদর্শ রমণীর উত্তম গুণাবলীর অন্যতম।

তুচ্ছ নয় রক্তদান বাঁচাতে পারে একটি প্রান

স্বামীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ ঈমানদার স্ত্রী

0

স্বামীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ ঈমানদার স্ত্রী

যে কারণে স্বামীর ইমানদার স্ত্রী শ্রেষ্ঠ সম্পদ; হাদিসে সে বিষয়গুলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুস্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করেছেন। তিনি পুরুষের জন্য চারটি বিষয়কে শুভলক্ষণ বলেছেন। আর তা হলো- নেককার নারী, প্রশস্ত ঘর, সৎ প্রতিবেশী এবং সহজ প্রকৃতির আনুগত্যশীল-পোষ্য বাহন। পক্ষান্তরে চারটি জিনিসকে কুলক্ষণা বলেছেন। তার মধ্যে একটি হলো বদকার নারী। (হাকেম, সহিহ আল জামে)

অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একজন ঈমানদার স্ত্রীকে তার স্বামীর জন্য শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। হাদিসটি তুলে ধরা হলো-

হজরত ছাওবান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘যখন এ আয়াত নাজিল হলো- ‘আর যারা সোনা-রূপা সঞ্চয় করে (আয়াতের শেষ পর্যন্ত); তখন আমরা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে কোনো এক সফরে ছিলাম।

তখন তাঁর এক সাহাবি বললেন, ‘এটাতো (আয়াত) সোনা-রূপা সর্ম্পকে নাজিল হলো। আমরা যদি জানতে পারতাম কোন সম্পদ উত্তম, তবে তা সঞ্চয় করতাম।

তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তোমাদের কারো শ্রেষ্ঠ সম্পদ হলো-
>> আল্লাহর জিকিরকারী রসনা (জিহ্বা);
>> কৃতজ্ঞ অন্তর; এবং
>> ঈমানদার স্ত্রী, যে তার ঈমানের (দ্বীনের) ব্যাপারে তাকে (স্বামীকে) সহযোগিতা করে। (মুসনাদে আহমদ, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ, মিশকাত)

হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘মাজাহেরে হক’ এ হাদিসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা বর্ণনা করেছেন। এ হাদিসে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈমানদার স্ত্রীর ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়েছেন। একজন ঈমানদার স্ত্রী তার স্বামীর জন্য সর্বোত্তম সম্পদও বটে।

দ্বীনের ব্যাপারে স্বামীকে সহযোগিতার মর্মার্থ হলো- ঈমানদার স্ত্রী ধর্মীয় কার্যক্রম ও দ্বীনি দায়িত্বসমূহ পালনের ক্ষেত্রে তার স্বামীকে সহযোগিতা করবে। যেমন-

নামাজের সময় হলে তার স্বামীকে নামাজের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে; রমজান মাসের রোজা রাখার ব্যাপারে স্বামীকে সহযোগিতা করবে।

অনুরূপভাবে একজন ঈমানদার স্ত্রী তার স্বামীকে ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি, পরিবারের আনুসাঙ্গিক কাজকর্মসহ অন্যান্য সব ইবাদত-বন্দেগিতেও স্বামীকে বুদ্ধি পরামর্শ ও উপদেশ দিয়ে যথাসাধ্য সহযোগিতা করবে।

ঈমানদার স্ত্রী বাড়িতে এমন পরিবেশ এবং আবহ সৃষ্টি করবে, যাতে স্বামী সারাক্ষণ পূণ্যকর্মে লিপ্ত থাকেন। অপকর্ম, অবৈধ উপার্জন এবং হারাম পেশা থেকে বিরত থাকেন।

এমনকি স্বামী যদি কোনো মন্দ কাজে লিপ্ত হন তবে ঈমানদার স্ত্রী তাকে সেই মন্দ কাজ থেকে ফিরিয়ে আনবে। অবাধ্য স্বামীকে মন্দ কাজ থেকে ফিরিয়ে আনতে তার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

এ কারণেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈমানদার নেক্কার স্ত্রীকে স্বামীর জন্য সর্বোত্তম সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহ সব নারীকে দ্বীনদার ও ঈমানদার হিসেবে কবুল করুন। পৃথিবীর সব মুমিন নারীকে নেককার সন্তান, নেককার স্ত্রী ও নেককার মা হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

তুচ্ছ নয় রক্তদান বাঁচাতে পারে একটি প্রান

কোরআনে কারিমে বলা হয়েছে জুয়া ঘৃণ্য কাজ

0


জুয়ার ইতিহাস বেশ প্রাচীন। বলা চলে। নবী করিম (সা.)-এর আগমনের সময় মক্কায় নানা ধরনের জুয়ার প্রচলন ছিল। বর্তমানে প্রাচীন পদ্ধতি ছাড়াও জুয়ার ক্ষেত্রে আরও বহু নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে। যেমন হাউজি, টাকা বাজি রেখে ঘোড় দৌড় ও তাস খেলা ইত্যাদি। এগুলো সবই হারাম।

ঢাকা ক্লাবসহ দেশের ১৩টি অভিজাত ক্লাবে আইন বহির্ভূতভাবে ও টাকার বিনিময়ে হাউজি, ডাইস ও তাস খেলা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

জনস্বার্থে সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবীর করা এক রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে রোববার (০৪ ডিসেম্বর) ২০১৬ এ আদেশ দেন বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী ও বিচারপতি শেখ হাসান আরিফের হাইকোর্ট বেঞ্চ।

রুলে অভ্যন্তরীণ খেলার নামে কার্ড, ডাইস ও হাউজি খেলার বেআইনি ব্যবসা আয়োজনকারীদের বিরুদ্ধে কেন যথাযথ পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেওয়া হবে না- তা জানতে চাওয়া হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশ ও চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ অধ্যাদেশ এবং পাবলিক গ্যাম্বলিং আইন অনুসারে টাকার বিনিময়ে জুয়া খেলা অবৈধ।

স্বাভাবিকভাবে সমাজে জুয়া খেলাকে ঘৃণিত ও গর্হিত কাজ হিসেবে দেখা হয়। ইসলামের দৃষ্টিতেও তা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং জুয়ার মাধ্যমে উপার্জিত সম্পদ হারাম।

জুয়াকে আরবিতে ‘মায়সির’ ও ‘কিমার’ বলা হয়। মায়সির ও কিমার এমন খেলাকে বলা হয়, যা লাভ ও ক্ষতির মধ্যে আবর্তিত থাকে। অর্থাৎ যার মধ্যে লাভ বা ক্ষতি কোনোটাই স্পষ্ট নয়।

জুয়ার ইতিহাস বেশ প্রাচীন। বলা চলে। নবী করিম (সা.)-এর আগমনের সময় মক্কায় নানা ধরনের জুয়ার প্রচলন ছিল। বর্তমানে প্রাচীন পদ্ধতি ছাড়াও জুয়ার ক্ষেত্রে আরও বহু নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে। যেমন হাউজি, টাকা বাজি রেখে ঘোড় দৌড় ও তাস খেলা ইত্যাদি। এগুলো সবই হারাম।

এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, শুধু নাম পরিবর্তনের কারণে বস্তুর মূল প্রকৃতি এবং হুকুম পরিবর্তন হয় না। কাজেই প্রাচীনকালে প্রচলিত জুয়া সম্পর্কে যে হুকুম প্রযোজ্য ছিল, আধুনিক কালের জুয়ার ক্ষেত্রেও সেসব হুকুম প্রযোজ্য।

ইসলামি শরিয়তে জুয়া হারাম। একাধিক আয়াত ও হাদিসে এ সম্পর্কে স্পষ্ট বিবরণ রয়েছে। কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি পূজার বেদি ও ভাগ্য নির্ণয়ক শর ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, তাহলেই তোমরা সফলকাম হতে পারবে। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে ও নামাজ আদায়ে বাধা দিতে চায়। তবে কি তোমরা নিবৃত্ত হবে না।’ -সূরা মায়িদা: ৯০-৯১

এ আয়াতে মদ ও জুয়াকে ঘৃণ্য বস্তু আখ্যায়িত করা হয়েছে। এগুলোকে শয়তানের কাজ বলা হয়েছে। আয়াতে এগুলো থেকে দূরে থাকার হুকুম করা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, এতে পরষ্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। অধিকন্তু এর দ্বারা শয়তান মানুষকে নামাজ আদায় করা এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ রাখে। কাজেই মদের ন্যায় জুয়াও হারাম। এর হারাম হওয়ার বিষয়টি কোরআনের অকাট্য দলীল দ্বারা প্রমাণিত। যদি কেউ এই হুকুমকে অস্বীকার করে, তবে সে কাফের বলে গণ্য হবে।

এ প্রসঙ্গে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, কেউ যদি তার সাথীকে বলে, এসো জুয়া খেলব। তাহলে (এ কথার অপরাধের কারণে) সদকা করা তার ওপর অপরিহার্য।

অতএব, জুয়াকে অর্থ উপার্জনের উপায় হিসেবে গ্রহণ করা যেমন কোনো মুসলমানের জন্য জায়েয নেই, তেমনি একে খেলা, মনের সান্ত্বনা, তৃপ্তি ও অবসর বিনোদনের উপায়রূপে গ্রহণ করাও বৈধ হতে পারে না।

এ ছাড়াও জুয়া খেলায় বহু অপকারিতা রয়েছে। যেমন- এ খেলায় যেমন অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়, তেমনি এতে মানুষের চারিত্রিক ক্ষতি সাধিত হয়।

জুয়ায় অভ্যস্ত ব্যক্তি ক্রমান্বয়ে উপার্জনের ব্যপারে অলস, উদাসীন ও নিস্পৃহ হয়ে যায়। জুয়ার জয়-পরাজয় মারামারি এমনকি হত্যাকান্ড পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। জুয়াড়ি ব্যক্তি জুয়ার নেশায় মাদকাসক্তের ন্যায় মাতাল থাকে সর্বদা। এ কারণে সে ছেলেমেয়ে, স্ত্রী ও আত্মীয় কারোর খবর রাখতে পারে না। জুয়াড়ি তার পরিবার-পরিজনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারে না, ছেলেমেয়েদেরকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত বানাতে পারে না। বরং তারাও পিতার দেখাদেখি ওই সর্বনাশা খেলায় আংশগ্রহণের প্রয়াস পায়। এভাবে জুয়াড়ির পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়।

জুয়াড়ির মেজাজ সর্বদা রুক্ষ্ম থাকে। আর রুক্ষ্ম মেজাজের মানুষগুলো হয় নিষ্ঠুর। জুয়ায় বিজয়ী আরও লাভের নেশায় মাতাল হয়ে উঠে‍। আর পরাজিত ব্যক্তি প্রতিশোধের নেশায় উন্মাদ হয়ে উঠে। তাই স্ত্রী, ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বিবাদ, ঝগড়া ও অশান্তি সর্বদা লেগে থাকে। বর্তমানে স্ত্রী কর্তৃক স্বামী হত্যা বা স্বামী কর্তৃক স্বামী হত্যা- এ জাতীয় লোমহর্ষক ঘটনার পেছনে জুয়ার প্রভাব লক্ষণীয়।

জুয়া খেলায় মানুষ আল্লাহ বিমুখ এবং নামাজ-রোজা তথা ইবাদত-বন্দেগির ব্যপারে চরম উদাসীন হয়ে যায়।কেননা জুয়াড়ির একমাত্র ধ্যান-ধারনা কেমন করে আরও টাকা বানানো যায় অথবা কেমন করে পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়া যায়। কাজেই জুয়ার এ সর্বনাশা গ্রাস থেকে বেঁচে থাকা অপরিহার্য।

সমাজে লটারি, হাউজি, বাজি ধরা, চাক্কি ঘোরানো ও রিং নিক্ষেপ থেকে শুরু করে প্রভৃতি নামে নানা ধরনের জুয়ার প্রচলন রয়েছে। এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামেও বসছে জুয়ার আসর। কৃষক, তরুণ, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীরা জড়িয়ে পড়ছেন মরণনেশা জুয়ায়। এসব আসরে উড়ছে লাখ লাখ টাকা। মাদকের মতোই জুয়ার ছোবল এখন দৃশ্যমান। এমতাবস্থায় দেশের সচেতন অভিভাবকদের প্রত্যাশা, অনৈতিক এসব জুয়ার আসর বন্ধে প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন।

সব ধরনের জুয়াবাজি অবৈধ এবং এর থেকে প্রাপ্ত সম্পদ হারাম। হারাম সম্পদ ভোগ করে ইবাদত-বন্দেগি করলে আল্লাহর দরবারে তা কবুল হয় না। তাই সব ধরনের জুয়াবাজি থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক।

তুচ্ছ নয় রক্তদান বাঁচাতে পারে একটি প্রান

ইস্তেগফার কি? তা কিভাবে করতে হয়

0


আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনাই হচ্ছে ইস্তেগফার । নিম্নে হাদিস অনুযায়ি ইস্তেগফার করার কিছু নিয়ম:

১। অস্তাগফিরুল্ল-হ (আমি আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করছি)।
প্রতি ওয়াক্তে ফরয সালাতে সালাম ফিরানোর পর রাসূল(সঃ) ৩বার পড়তেন ।(মিশকাত)

২।অস্তাগফিরুল্ল-হি ওয়া আতুবু ইলাইহি(আমি আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করছি ও তার দিকে ফিরে আসছি)
রাসূল(সঃ) প্রতিদিন ৭০ বারের অধিক তাওবা ও ইস্তিগফার করতেন।(বুখারি)।

৩।রাব্বিগ ফিরলী,ওয়া তুব আলাইয়্যা ইন্নাকা আনতাত তাওয়াবুর রাহীম।(হে আমার প্রভু,আপনি আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার তাওবা কবুল করুন।নিশ্চয় আপনি মহান তাওবা কবুলকারী)
২য় বর্ননায়”রাহীম” এর বদলে গাফূর ।অর্থ-তাওবা কবুলকারী ও ক্ষমাকারী।
রাসূল(সঃ) এক বৈঠকে এই দোয়া ১০০ বার পড়তেন ।(আবু দাউদ,ইবনে মাজাহ,তিরমিযি,মিশকাত­)

৪।অস্তাগফিরুল্লা-হাল­্লাজী লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম ওয়া আতুবু ইলাইহি(আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই তিনি ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোন মাবুদ নাই,তিনি চিরন্জ্ঞিব,চিরস্থায়ি­ এবং তার কাছে তওবা করি)
এই দোয়া পড়লে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিবেন যদিও সে যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়নকারি হয়।(আবু দাউদ,তিরমিযি,মিশকাত)­।

৫।সাইয়্যেদুল ইস্তেগফার-আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাওয়ার শ্রেষ্ঠ দোয়া।
এই দোয়া সকালে পড়ে দিনে মারা গেলে অথবা রাতে পড়ে রাতেই মারা গেলে জান্নাতে যাবে।(বুখারি)

এ দোয়া গুলোই হলো ইস্তেগফার।যে কোন ১টা পড়তে পারেন।আবার সব গুলো ও পড়তে পারেন।
.

তুচ্ছ নয় রক্তদান বাঁচাতে পারে একটি প্রান

হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) জীবনী ও ঘটনা

0

 

হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) জীবনী ও ঘটনা

ইসলামের প্রথম খলিফা; অপর নাম ‘আতীক~ । হাদিসে ইহার নানারূপ ব্যাখ্যা আছে । তাহার প্রকৃত নাম ছিল আব্দুল্লাহ্‌ । তাহার পিতা উসমান, অন্য নাম আবু কুহাফা ও মাতা উম্মুল খায়র সাল্‌মা বিনতে সাখ্‌র । উভয়ই মক্কার কা~ব ইবন সা~দ ইবন তায়ম ইব্‌ন মুর্‌রা পরিবারের লোক । প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী আবু বাকর (রাঃ) এর বয়স ছিল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এর চেয়ে তিন বৎসর কম । তিনি ছিলেন মক্কার একজন ধনবান বনিক ও হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এর প্রাচীনতম সমর্থকদের অন্যতম । অনেকের মতে পুরুষদের মধ্যে তিনিই প্রথম মুসলমান । তাহার চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হইল ইলাহী প্রত্যাদেশ (ওয়াহি) এর নির্বাচিত মাধ্যম বলিয়া হযরত (সঃ) এর প্রতি তাহার অটল বিশ্বাস । হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এর মিরাজের বিবরণ শুনিয়া কেহ কেহ সন্দেহ প্রকাশ করে । হুদায়বিয়ার সন্ধি সম্পর্কে হযরত (সঃ) এর আচরণ কিভাবে গ্রহণ করিবে অনেকেই বুঝিতে পারিতেছিল না । কিন্তু হযরত (সঃ) এর উপর আস্থায় আবু বকর (রাঃ) তখনও ছিলেন অবিচল । ইবন ইসহাক এর মতে, এই অবিচল বিশ্বাসের দরুনই তিনি ~আস-সিদ্দিক- উপাধি প্রাপ্ত হন । ইসলামের ঐতিহাসিক বিবরণগুলির আদ্যান্ত এই উপাধি তাহার নামের সহিত জড়িত রহিয়াছে । তিনি ছিলেন নম্র প্রকৃতির লোক । কুরআন পাঠের সময় তাহার অশ্রু নির্গত হইত । তাহার কন্যা বলিয়াছেন, হিজরতের সময় হযরত (সঃ) এর সঙ্গে যাইতে পারিবেন শুনিয়া তিনি আনন্দে ক্রন্দন করেন । তিনি ছিলেন সরল ও চিন্তাশীল ।
হযরত (সঃ) এর শিক্ষার বিশুদ্ধ নৈতিক উপদেশসমূহ তাহার মনে তীব্র অনুভূতি জাগায় । বহু ক্রীতদাস খরিদ করিয়া মুক্তিদান ও অন্যান্য অনুরূপ কার্যদ্বারা তিনি ইহার প্রমাণ দেন । ইসলামের খাতিরে কোন আত্মত্যাগই তাহার নিকট খুব বড় বলিয়া মনে হইত । ইহার ফল এই দাঁড়ায় যে, তাহার ৪০ হাজার দিরহাম মূল্যের সম্পত্তির মধ্যে তিনি মদিনায় মাত্র ৫ হাজার দিরহাম লইয়া যাইতে সমর্থ হন । ভীষণতম বিপদের মধ্যেও তিনি বিশ্বস্ততার সহিত তাহার বন্ধু ও শিক্ষকের পার্শ্বে দন্ডায়ান থাকেন । সর্বাপেক্ষা সংকটময় সময়ে যে অত্যল্প সংখ্যক লোক আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন নাই, তিনি ছিলেন তাহাদের মধ্যে অন্যতম । বানু হাশিমকে মক্কা সমাজ হইতে বহিষ্কৃত করা হইলে তখনকার মত কেবল একবার তিনি বিচলিত হন বলিয়া কথিত আছে । তজ্জন্য তিনি মক্কা ত্যাগ করেন; কিন্তু জনৈক প্রতিপত্তিশালী মক্কাবাসীর আশ্রয়ে শীঘ্রই ফিরিয়া আসেন । তাহার অই রক্ষক তাহাকে নিঃসঙ্গ অবস্থায় ত্যাগ করিলেও তখনও তিনি মক্কা শহরে অবস্থান করেন । তাহার জীবনের চরম গৌরবের দিন আসে যখন হযরত (সঃ) মদিনায় হিজরত করার সময় তাহাকে স্বীয় সঙ্গী হিসেবে মনোনীত করেন । আল্লাহ্‌ তাআলা আল-কুরআনে ~দুই জনের মধ্যে দ্বিতীয়- (সুরা ৯ঃ আয়াত ৪০) আখ্যায় তাহার নাম অমর করিয়া এই আত্মত্যাগী মহান ভক্তকে পুরস্কৃত করেন । পুত্র আব্দুর রহমান ব্যতীত তাহার পরিবারের অন্যান্য সদস্যও মদিনায় হিজরত করেন; আব্দুর রাহমান কাফির থাকা অবস্থায় বদরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অংশ নেন । পরিশেষে তিনিও ইসলামে দীক্ষিত হইয়া মদিনায় হিজ্রাত করেন । এই নূতন আবাসে আল-সুনুহ্‌ শহরতলীতে আবু বাকর (রাঃ) অনাড়ম্বর গৃহাস্থালী স্থাপন করেন । হিজ্রাতের পূর্বে ৬২০ খ্রিষ্টাব্দে হযরত(সঃ) তাহার কন্যা আইসার (রাঃ) পাণি গ্রহণ করিয়াছিলেন । এই বিবাহের মাধ্যমে উভয়ের বন্ধন আরো দৃঢ় হয় । আবু বাকর (রাঃ) প্রায় সর্বদাই হযরত (সঃ) এর সঙ্গে থাকিতেন এবং তাহার সমস্ত অভিযানে তিনি তাহার সঙ্গে গমন করেন । পক্ষান্তরে তাহাকে কদাচিৎ সামরিক অভিযানের পরিচালক নিযুক্ত করা হইত । তাবূক অভিযানে তাহার উপর পতাকা ধারণের ভার অর্পিত হয় । কিন্তু নবম হিজরিতে (৬৩১ খৃঃ) হযরত (সঃ) তাহাকে হাজ্জ পরিচালনা করিতে আমীরুল হাজ্জ হিসাবে মক্কায় প্রেরণ করেন । হাদিছের বর্ননানুসারে এই উপলক্ষে আলী (রাঃ) কাফিরদের সহিত সম্পর্কচ্ছেদের আয়াত পাঠ করিয়া শোনান । হযরত (সঃ) অসুস্থ হইয়া পড়িলে তৎপরিবর্তে আবু বাকর (রাঃ) এর উপর মসজিদে নাববির জামা~আতে ইমামাত করার ভার ন্যস্ত হয় । ৮ই জুন ৬৩২ খৃঃ হযরত (সঃ) এর ওফাত হইলে উমার (রাঃ) ও তাহার বন্ধুগণ আবু বাকর (রাঃ) এর এই সম্মানের ভিত্তিতে মুসলিম সমাজের প্রধানরূপে তাহার নাম প্রস্তাব করেন । তিনি কোনরূপেই সমাজে কোন নূতন ধারনা বা নীতির প্রবর্তন করেন নাই । তিনি হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এর চতুস্পার্শে যে সকল প্রতিভা সমবেত হন, তাহাদিগকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সমর্থ হন । সরল অথচ দৃঢ় চরিত্র বলে তিনি হযরত (সঃ) এর প্রতিরূপ বলিয়া প্রতিপন্ন হন । সর্বাপেক্ষা কঠিন ও বিপজ্জনক সময়ে নবীন মুসলিম সমাজের পরিচালনা করেন এবং মৃত্যুকালে উহাকে এত মজবুত ও দৃঢ় অবস্থায় রাখিয়া যান যে, উহা শক্তিশালী ও প্রতিভাবান উমার (রাঃ) এর খিলাফাত পরিচালনার পথ সুগম করে ।

প্রথমে তিনি হযরত (সঃ) এর ওফাতের পর আরবের আশঙ্কাজনক অবস্থা সত্ত্বেও যুবক উসামা এর অধীনে জর্ডান নদীর পূর্বাঞ্চলে পূর্ব নির্ধারিত একটি অভিযান প্রেরণ করিয়া হযরত (সঃ) এর আদেশের প্রতি পূর্ন আনুগত্যের প্রমাণ দেন । ইতিমধ্যে চতুর্দিকস্থ জনপদের গোত্রগুলি মদিনার রাজনৈতিক প্রাধান্যের বিরুদ্ধে মাথা তুলিতে আরম্ভ করে । আবু বাকর (রাঃ) তাহাদের যাকাত নাকচের দাবী প্রত্যাখ্যান করেন । উসামা বাহিনী স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিলে তিনি জুল কাস্‌সার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন এবং প্রতিভাশালী সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে আবু বাকর (রাঃ) সেনাদলের পরিচালক নির্বাচন করেন । খালিদ আসাদ ও ফাযার কে আল বুযাখা তে পরাজিত ও তামীম গোত্রকে পদানত করেন । পরিশেষে জান্নাতুল মাওত এ আল আক্‌রাবা এর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বানু হানীফাকে ইসলামী শক্তির অধীনে আনয়ন করেন । যুদ্ধে তাহার এই সাফল্যের দরুন অন্য সেনাপতিদের পক্ষে বাহ্‌রায়ন ও উমানের বিদ্রোহ দমন সম্ভবপর হয় । পরিশেষে ইক্‌রিমা ও আল মুহাজির ইয়ামান ও হাদ্‌রামাওত পুনরায় মদীনা রাষ্ট্রের অধীনে আনয়ন করেন । হযরত (সঃ) এর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করিয়া আবু বাকর (রাঃ) পরাজিত গোত্রগুলির সহিত সদয় ব্যবহার করেন এবং এইভাবে রাজ্যে পুনরায় শান্তি
দুই বিখ্যাত সাহাবী আবু বকর (রা) ও উমার (রা) কথা বলছিলেন”-

দুই বিখ্যাত সাহাবী আবু বকর (রা) ও উমার (রা) কথা বলছিলেন। হঠাৎ আবু বকরের কথায় উমার মারাত্মক রেগে গেলেন। এমনকি ওই স্থান ছেড়ে চলে গেলেন। আবু বকর (রা) খুবই লজ্জিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে উমারের পেছনে পেছনে ছুটতে লাগলেন আর বলতে লাগলেন, ‘ভাই উমার, আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।’ উমার (রা) ফিরেও তাকাচ্ছেন না! এক পর্যায়ে তিনি বাড়ি চলে গেলেন, পেছনে পেছনে আবু বকরও তার ঘরের দরজায় পা রাখলেন। কিন্তু উমার (রা) আবু বকর (রা) এর মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেন। উদ্বিগ্ন আবু বকর ছুটে গেলেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স) এর কাছে। একটু পর উমারও সেখানে হাজির। আসলে দুজনই অনুতপ্ত, লজ্জিত। উমার (রা) নিজের দোষ স্বীকার করে সব বর্ণনা দিলেন, কীভাবে আবু বকরের মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দিয়েছেন তিনি। সব শুনে রাসূল (স) উমারের উপর খুবই অসন্তুষ্ট হলেন। আবু বকর (রা) আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি বলতে লাগলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! ভুল আমারই হয়েছে, তার কোন ভুল নেই।’ তিনি উমার (রা) কে নির্দোষ প্রমাণ করতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৪২৭৪)

সুবহানাল্লাহ। কী চরিত্র, কী বিনয়, কী আচরণ! সোনার মানুষ ছিলেন তাঁরা, সত্যিই সোনার মানুষ। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষটির শিষ্যগণ তো এমনই হবেন। আমরা কত বড় দুর্ভাগা যে, তাঁদের জীবনীটা কখনো পড়ে দেখিনি, তাঁদেরকে উত্তম আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করার চিন্তাও করিনি। তাঁদেরকে জানুন। টপ টপ করে চোখ দিয়ে পানি পড়বে তাঁদের জীবনী পড়লে। তাঁদের অন্তরগুলো ছিল স্ফটিকের মত স্বচ্ছ। তাঁরা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই একে অপরকে ভালবাসতেন। এই পয়েন্টটিতে কেন আমরা এত পিছিয়ে? একই পথের পথিক হয়েও কেন আমাদের মধ্যে এত হিংসা, বিদ্বেষ, শত্রুতা? নিশ্চিত থাকুন, আখিরাতে এর চরম মূল্য দিতে হবে।

অন্যের সাথে মন্দ আচরণের প্রতিবিধান

রাবী‘আহ আল-আসলামী বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর খিদমত করতাম। ফলে তিনি আমাকে ও আবুবকর (রাঃ)-কে এক খন্ড জমি দান করলেন। অতঃপর দুনিয়ার চাকচিক্য আসল। ফলে একটি খেজুরের কাঁদিকে কেন্দ্র করে আমরা বিতর্কে জড়িয়ে পড়লাম। আবুবকর (রাঃ) বললেন, এটা আমার জমির সীমানার মধ্যে। আমি বললাম, না এটা আমার জমিতে। (এ বিষয়ে) আমার ও আবুবকর (রাঃ)-এর মধ্যে কথা কাটাকাটি হ’ল। আবুবকর (রাঃ) আমাকে এমন একটা কথা বললেন যেটা আমি অপসন্দ করলাম। এজন্য তিনি অনুতপ্ত হয়ে আমাকে বললেন, হে রাবী‘আহ! তুমি অনুরূপ কথা বলে প্রতিশোধ নিয়ে নাও, যাতে ওর কিছাছ হয়ে যায়। আমি বললাম, না আমি তা করব না। অতঃপর আবুবকর (রাঃ) বললেন, তুমি অবশ্যই বলবে নতুবা তোমার বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করব (অর্থাৎ নালিশ করব)। আমি বললাম, এটা করতে পারব না। রাবী বলেন, তিনি জমি প্রদান করতে অস্বীকৃতি জানালে আবুবকর (রাঃ) আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট গমন করলেন। আমিও তার পদাংক অনুসরণ করে চললাম। এরই মধ্যে আসলাম গোত্রের কিছু লোক এসে বলল, আল্লাহ আবুবকর (রাঃ)-এর উপর রহম করুন! কোন বিষয়ে তিনি তোমার বিরুদ্ধে রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট নালিস করছেন। অথচ তিনি যা ইচ্ছা তাই তোমাকে বলেছেন? আমি বললাম, তোমরা কি জান তিনি কে? ইনিই হচ্ছেন আবুবকর ছিদ্দীক, (দু’জনের ২য় জন)। তিনি মুসলমানদের মধ্যে সর্বাধিক শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। সুতরাং তোমরা তার ব্যাপারে সতর্ক থাক। তিনি তাকালে দেখবেন যে, তোমরা আমাকে তার বিরুদ্ধে সাহায্য করছ। যার ফলে তিনি ক্রোধে ফেটে পড়বেন এবং রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে যাবেন। অতঃপর তাঁর ক্রোধের কারণে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ক্রোধান্বিত হবেন। আর তাদের দু’জনের ক্রোধের কারণে আল্লাহ ক্রোধান্বিত হবেন। তখন রাবী‘আহ ধ্বংস হয়ে যাবে। তারা বলল, তাহ’লে তুমি আমাদের কি করার নির্দেশ দিচ্ছ? তিনি বললেন, তোমরা ফিরে যাও। আবুবকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলেন এবং আমি একাকী তার পশ্চাদ্বাবন। নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট পৌঁছে তিনি তাঁর নিকট সকল ঘটনা বর্ণনা করলেন। অতঃপর তিনি আমার দিকে মাথা উঁচু করে বললেন, ‘হে রাবী‘আহ! তোমার ও আবুবকর (রাঃ)-এর মধ্যে কি ঘটেছে? আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! ঘটনা ছিল এরূপ এরূপ। অতঃপর তিনি আমাকে এমন কথা বললেন, যা আমি অপসন্দ করি। ফলে তিনি আমাকে বললেন, আমি তোমাকে যেমন বলেছি তুমি আমাকে তেমন বল, যাতে সেটার প্রতিদান (কিছাছ) হয়ে যায়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, হ্যাঁ তুমি তাঁর জবাব দিবে না। বরং বলবে, হে আবুবকর! আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দিন, হে আবুবকর! আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দিন। রাবী বলেন, (রাসূল (ছাঃ)-এর এ নির্দেশ শুনে) আবুবকর (রাঃ) ক্রন্দনরত অবস্থায় ফিরে গেলেন (ছহীহাহ হা/৩২৫৮)।

আবুবকর (রাঃ) -এর মৃত্যুকালীন অছিয়ত

ইসলামের ১ম খলীফা আবুবকর ছিদ্দীক্ব (রাঃ)-এর মৃত্যুক্ষণ উপস্থিত হ’লে তিনি সূরা ক্বাফ-এর ১৯নং আয়াতটি তেলাওয়াত করেন (‘মৃত্যুযন্ত্রণা অবশ্যই আসবে; যা থেকে তুমি টালবাহানা করে থাক’)। অতঃপর তিনি স্বীয় কন্যা আয়েশা (রাঃ)-কে বললেন, আমার পরিহিত দু’টি কাপড় ধুয়ে তা দিয়ে আমাকে কাফন পরিয়ো। কেননা মৃত ব্যক্তির চাইতে জীবিত ব্যক্তিই নতুন কাপড়ের অধিক হকদার। অতঃপর তিনি পরবর্তী খলীফা হযরত ওমর (রাঃ)-কে অছিয়ত করেন এই মর্মে যে, ‘নিশ্চয়ই রাত্রির জন্য আল্লাহ এমন কিছু হক নির্ধারণ করে রেখেছেন, যা তিনি দিবসে কবুল করেন না। আবার দিবসের জন্য এমন কিছু হক নির্ধারণ করেছেন, যা রাতে কবুল করেন না। কোন নফল ইবাদত কবুল করা হয় না, যতক্ষণ না ফরযটি আদায় করা হয়। নিশ্চয়ই আখেরাতে মীযানের পাল্লা হালকা হবে দুনিয়ার বুকে বাতিলকে অনুসরণ করা এবং নিজের উপর তা হালকা মনে করার কারণে। অনুরূপভাবে আখেরাতে মীযানের পাল্লা ভারী হবে দুনিয়াতে হক অনুসরণ করা এবং তাদের উপর তা ভারী হওয়ার কারণে’।

শিক্ষা:

রাষ্ট্রীয় গুরুদায়িত্ব পালনকারীর জন্য অলসতা ও বিলাসিতার কোন সুযোগ নেই। তাকে কোন অবস্থাতেই বাতিলের সাথে আপোষ করা চলবে না। বরং যেকোন মূল্যে সর্বাবস্থায় হক তথা আল্লাহ প্রেরিত সত্যকে কঠিনভাবে আঁকড়ে ধরে থাকতে হবে। কেননা দুনিয়াতে সকল কাজের উদ্দেশ্য হবে আখেরাতে মীযানের পাল্লা ভারী করা।
একটি প্রশান্তময় গৃহ।

ছায়াঘেরা শান্ত সুনিবিড়। কল্যাণ আর অফুরন্ত আলোর রোশনিতে সীমাহীন উজ্জ্বল। কার বাড়ি? কোন্ বাড়ি?

আঙ্গুল উঁচিয়ে দেখিয়ে দেন সবাই। এতো মদিনার সেই বাড়ি, যে বাড়িতে প্রথমে পবিত্র পা রেখেছিলেন নবী মুহাম্মদ (সা)।মহান আলোকিত রাসুল! রাসূলের (সা) সঙ্গে ছিলেন সেদিন তাঁরই সাথী হযরত আবু বকর (রা)। হ্যাঁ, সেইদিন। যেদিন রাসুল (সা) আবু বকরকে নিয়ে পৌছলেন মদিনায়। মদিনার কুবা পল্লী। চারপাশ তার স্নিগ্ধ, শান্ত। কী এক মোহময় পরিবেশ। অসীমতার মায়ার বন্ধন। রোশনীতে আলো ঝলমল। যেন সোনার মোহর ছড়িয়ে আছে পূর্ণিমা জোছনায়। চকচক করছে কুবা পল্লীর প্রতিটি ধূলিকণা! তাও যেন রূপ নিয়েছে একেবারে খাঁটি সোনায়। একেবারেই খাদহীন। কে জানে না কুবা পল্লীর নাম? কে চেনে না তার পথঘাট, গলি, প্রান্তর? সবাই চেনে। সবাই জানে। জানে এবং চিনে মদিনার ও মক্কার প্রতিটি মানুষ। কেন চিনবে না? কুবা পল্লী তো বুকে ধারণ করে আছে এক উজ্জ্বল ইতিহসা, ইতিহাসের চেয়েও মহান এক সত্তা। আল্লাহর পক্ষ থেকে হিজরতের অনুমতি পেলেন দয়ার নবীজী (সা)। এটাই প্রথম হিজরত! রাসূল (সা) চলেছেন অতি সন্তর্পণে। সামনে দিকে। সাথে আছেন বিশ্বস্ত বন্ধু হযরত আবু বকর (রা)। রাসূল (সা) ছেড়ে যাচ্ছেন তাঁর প্রিয় জন্মভূমি মক্কা। সেই মক্কা! যেখানে তিনি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন সাগর সমান রহমত নিয়ে। যেখানে কেটেছে তাঁর শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনের দিনগুলো। কত স্মৃতি, কত কথা, কত ঘটনা প্রবাহ মনে পড়ছে দয়ার নবীজীর (সা)। তিনি হাঁটছেন আর পেছনে তাকাচ্ছেন। দয়ার নবীজীর ভারী হয়ে উঠলো স্মৃতিবাহী হৃদয়। তাঁকে ছেড়ে যেতে হচ্ছে ভালোবাসার মক্কা! মক্কা থেকে রাসূল (সা) চলেছেন মদিনার দিকে। এটাই আল্লাহর মঞ্জুর। এটাই প্রথম হিজরত। মদিনর উপকণ্ঠে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে কুবা পল্লী। বহু পূর্ব থেকেই কুবা পল্লীর রয়েছে ঐতিহ্যেঘেরা সুনাম ও খ্যাতি। আল্লাহর প্রিয় হাবীব রাসূলে মকবুল (সা) ও তাঁর সাথী আবুবকর কুবা পল্লীতে পৌঁছেই একটু থমকে দাঁড়ালেন। তারপর।

২য় অংশ

মহান মেজ্ববান।

তারপর তিনি এবং তাঁর সাথী প্রবেশ করলেন কুবা পল্লীর অতি খান্দানী একটি বাড়িতে।

বাড়িটি কার?

কে সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি?

তিনি আর কেউ নন। নাম কুলসুম ইবনুল হিদম (রা)।

রাসূলও (সা) দারুণ পছন্দ করলেন বারিটি। এখানেই তিনি তাঁর সাথী আবুবকরসহ কাটিয়ে দিলেন একে একে চারটি দিন।কুলছুম ইবনুল হিদমের (রা) বাড়িতে চারদিন থাকার পর দয়ার নবীজী (সা) পৌছুলেন মদিনার মূল ভূখণ্ডে। এখঅনে এসে রাসূল (সা) ও আবুবকর (রা) অবস্থান করেন আর এক সৌভাগ্যবান সাহাবী আবু আইউব আল আনসারীর বাড়িতে। কিন্তু রাসূল (সা) মদিনার পদধূলি দিয়েই যার বাড়িতে উঠলেন, তিনি কুলসুম ইবনুল হিদম। রাসূল (সা) উপস্থিত তার বাড়িতে! কি সৌভাগ্যের ব্যাপার! আনন্দ আর ধরে না তার হৃদয়ে। খুশিতে বাগবাগ। কিযে করবেন রাসূলের (সা) জন্য, কিভাবে যে বরণ করে নেবেন এই মহিমান্বিত মেহমানকে। দিশা করতে পার ছেন না কুলসুম ইবনুল হিদম (রা)। মুহূর্তেই তিনি হাঁকডাক শুরু করলেন। ডেকে জড়ো করলেন বাড়ির চাকর-বাকরকে। ডাক পেয়েই ছুটে এলো সকলেই। তাদের মধ্যে একজনের নাম ছিল নাজীহ। কুলসুম নাজীহকে তার নাম ধরে ডাক পারলেন। রাসূলের (সা) কানে গেল নামটি। নাজীহ অর্থ সফলকাম। রাসূল (সা) নামটি শুনেই সাথী আবুবকরকে (রা) বললেন, হে আবুবরক! তুমি সফলকাম হয়েছো। এই বাড়িতে শুধু রাসূলই (সা) নন। সে সময় রাসূলের (সা) অনেক সঙ্গী-সাথীই মেহমান হিসেবে তার বাড়িতে অবস্থান করেছিলেন। যেমন রাসূল (সা) ও আবুবকর (রা) কুলসুমের (রা) বাড়িতে অবস্থানের মধ্যেই সেখানে উপস্থিত হলেন মক্কার পথ পেছনে ফেলে আলী ও সুহাইব (রা)। তাঁরাও অবস্থান করলেণ কুলসুমের (রা) বাড়িতে। এছাড়াও তার বাড়িতে উঠেছিলেন মক্কা থেকে আগত রাসূলের (সা) একান্ত সাথী আবু মাবাদ আল মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রা), যায়িদ ইবনে হারিসা (রা), আবু মারসাদ কান্নায ইবন হিসন (রা), আবু কাবশা (রা) প্রমুখ সাহাবী। চমর ‍দুঃসময়ে কুলসুম এইভাবে খুলে রেখেছিলেন তাঁর বাড়ির দরোজা নবীর (সা) সাথীদের জন্য। রাসূল (সা) মদিনায় আছেন। মক্কা থেকে একে একে অনেকেই এসেছেন সেখানে হিজরত করে। খুব কাছের সময়। মদিনায় তৈরি হচ্ছে মসজিদে নববী। সেই সাথে তৈরির কাজ চলছে রাসূলের (সা) বিবিদের আবাসস্থল। তখন, ঠিক তখনই ইন্তেকাল করলেন কুলসুম ইবনুল হিদম (রা)। রাসূলের (সা) মদিনায় আগমনের পর কোনো আনসারী সাহাবীর (রা) এটাই প্রথম ইন্তেকাল! না। এতটুকুও কষ্ট পেলেন না কুলসুম ইবনুল হিমদ (রা)। বরং তিনি এক প্রফুল্ল চিত্তে, মহা খুশি ও আনন্দের মধ্যেই চলে গেলেন, জীবনের ওপারে। কেন তিনি কষ্ট পাবেন? কেন তিনি ব্যথিত হবেন তাঁর তো রয়েছে রাসূলের (সা) ভালোবাসা। রয়েছে তার চেয়ে অনেক অধিক সম্পদ। রাসূলের (সা) মেজবান হবার, প্রথম সৌভাগ্যের পরশ।

সফল তিনি।

সফল আশ্চর্য এক মহান মেজবান কুলসুম ইবনুল হিদম দুনিয়া ও আখেরাতে।

উপাধিতে ভূষিত করলেন।

হযরত আবু বকর (রা) সারাটি জীবন রাসূলের (সা) সর্বপ্রথম গেলেন আবু বকরের বাড়িতে। তাকেই জানালেন সমস্ত ঘটনা। এবং কী আশ্চর্য! হযরত আবু বকরও রাসূলের (সা) সাথে হিজরত করার সৌভাদ্য লাভ করলেন।

হযরত খাদিজার (রা) ইন্তেকালের পর বিমর্ষ হয়ে পড়লেন রাসূল (সা)। এ সময়ে হযরত আবু বকর নিজের আদরের কন্যা হযরত আয়েশাকে(রা) বিয়ে দিলেন রাসূলের (সা) সাথে।

হিজরতের পর প্রতিটি অভিযানে হযরত আব বকর ছিলে মুসলিম বাহিনীর পতাকাবাহী।

তাবুক যুদ্ধ!

তাবুক অভিযানে হযরত আব বকর ছিলেন মুসলিম বাহিনীর পাতাকাবাহী। এই অভিযানের সময় তিনি রাসূলের (সা) আবেদনে সাড়া দিয়ে তার সকল অর্থ রাসূলের (সা) হাতে তুলে দেন।

অবাক হয়ে রাসূল (সা) জিজ্ঞেস করলেন,

‘ছেলে-মেয়েদের জন্য কিছু রেখেছো কি?’

জবাবে আবু বকর (রা) বললেন,

‘তাদের জন্য আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলই যথেষ্ট।’

রাসূলের (সা) ওফাতের পর প্রথম খলিফা নির্বাচিত হলেন হযরত আবু বকর (রা)।

খলিফা নির্বাচিত হবার পর তিনি সমবেত মুহাজির ও আনসারদের উদ্দেশ্যে একটি ভাষণ দিলেন। সেই ঐতিহাসিক ভাষণটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন:

‘আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই আমাকে খলিফা নির্বাচিত করা হয়েছে।

আল্লাহর কসম!

আমি চাচ্ছিলাম আপনাদের মধ্য থেকে অন্য কেউ এ দায়িত্ব গ্রহণ করুক।

আমি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আপনারা যদি চান আমার আচরণ রাসূলের (সা) আচরণের মত হোক, তাহলে আমাকে সেই পর্যায়ে পৌঁছার ব্যাপারে অক্ষম মনে করবেন। কারণ তিনি ছিলেন নবী। তিনি যাবতীয় ভুল-ত্রুটি থেকে পবিত্র ছিলেন। তাঁর মত আমার কোনো বিশেষ মর্যাদা নেই।

আমি একজন সাধারণ মানুষ। আপনাদের কোনো একজন সাধারণ ব্যক্তি থেকেও উত্তম হওয়ার দাবি আমি করতে পারি না।.. আপনারা যদি দেখেন আমি সঠিক কাজ করছি, তবে আমাকে সহযোগিতা করবেন। আর যদি দেখেন আমি বিপথগামী হচ্ছি, তাহলে আমাকে সতর্ক করে দেবেন।’

হযরত আবু বকর (রা) ছিলেন যেমনই কোমল, তেমনই আবার দৃঢ়। তার এই মহৎ চরিত্রের কারণে তিনি ছিলেন অনন্য।

রাসূলের (সা) ওফাতের পর হযরত আবুবকরের (রা) খিলাফতকালে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য ও সংহতি বিরাজ করে। কিন্তু তার সবচেয়ে যে বড় অবদান তা হলো- পবিত্র আল ‍কুরআন সঙ্কলন ও সংরক্ষণ।

হযরত আবু বকর (রা) ছিলেন যেমনই মর্যাদাবান, তেমনি সম্মানিত এক সাহাবী।

আল্লাহর রাসুল (সা) প্রতিদিন নিয়মিত যেতেন তার বাড়িতে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তার পরামর্শ গ্রহণ করতেন।

রাসূলের (সা) বর্ণনায় এবং আল কুরআনেও হযরত আবু বকরের (রা) মর্যাদা সম্পর্কে বিশেষভাবে উল্লেখিত হয়েছে।

তার আত্মত্যাগ, তার ধৈর্য, সাহস, বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা এবং হীরক সমান জ্ঞান- এসবই ইসলামের বিজয়ের জন্য কাজ করেছে বিপুলভাবে।

হযরত আবু বকর (রা)! তার উপমা- নদী তো নয়, বিশাল সাগর। সাগরের অধিক। আমরা এখনো যেন শুনতে পাই সেই দূর সাগরের ডাক।

আবু বকর উমরকে চাইলেন উসামার কাছে মুসলিম বাহিনী যাত্রা করেছে মু’তা অভিযানে।

বাহিনীর সেনাপতি উসামা বিন যায়েদ।

উসামা ঘোড়ায় সওয়ার।

বাহিনীকে বিদায় দেয়ার জন্য খলিফা আবু বকর উসামার ঘোড়ার পাশাপাশি হেঁটে চলেছেন।

অস্বস্তিবোধ করছেন উসামা।

মহামান্য খলিফাতুল রাসূল (রা) হাঁটবেন আর উসামা তাঁরই সামনে ঘোড়ায় বসে থাকবে।

উসামা খলিফা আবু বকর (রা)-কে বললেন, হে খলিফাতুর রাসূল, আপনি সাওয়ারিতে উঠুন, নয়তো আমি ঘোড়া থেকে নেমে পড়ব।

সংগে সংগে আবু বকর (রা) বললেন, ‘আল্লাহর কসম, তুমি নিচে নেমনা।’

এই কথা আবু বকর (রা) তিন বার উচ্চারণ করলেন।

অথচ এই উসামা আযাদ করা দাস যায়েদের সন্তান।

উসামার এই বাহিনীতে উমর ছিলেন এক সাধারণ সৈনিক।

উসামার বাহিনীর সাথে উমারও যাচ্ছেন মু’তা অভিযনে।

শেষ মুহূর্তে খলিফা আবু বকরের মনে পড়ল, উমরের মদীনা থেকে অনুপস্থিত থাকা উচিত নয়।

তাঁকে খলিফার দরকার হবে।

কিন্তু তিনি তো উমর (রা)-কে মদনিায় থাকার নির্দেশ দিতে পারেন না।

সেনাপতি উসামা তাঁর একজন সৈনিকিকে নিয়ে যাবেন না রেখে যাবেন, সে সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ উসামার।

খলিফা আবু বকর উসামাকে নির্দেশ নয় অনুরোধ করলেন, ‘যদি আপনি ভাল মনে করেন, তবে অনুগ্রহপূর্বক উমরকে আমার সাহায্যের জন্যে রেখে যান।’

ইসলামের এই সাম্য ও গণতন্ত্রের কোন তুলনা নেই পৃথিবীতে।

আল্লাহর রাহে খরচের আকাংখ্যা

অষ্টম হিজরী সাল।

সাইফুল বাহার যুদ্ধে যোগদান করেছে মুসলিমানদের একটি ছোট্ট বাহিনী। এই তিনশ, সদস্যের বাহিনীর মধ্যে আবু বকর (রা) ও উমর (রা) ছিলেন। আর ছিলেন মদীনার খাজরাজ সর্দার সা‘আদ বিন উবাদাহর ছেলে কায়েস (রা)। এই মুসলিম বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন আবু উবায়দাহ ইবনুল যাররাহ (রা)। অভিযানকালে মুসলিম বাহিনীর রসদ ফুরিয়ে গেলে ভয়ানক সংকটে পড়ল তারা। এই অবস্থা দেখে কায়েস উট ধার করে এনে সবার জন্যে জবাই করতেন।

এভাবে তিনি তিন দিনে ৯টি উট ধার করে জবাই করার পর আবু বকর ও উমর চিন্তিত হয়ে পড়লেন এবং অধিনায়ক আবু উবায়াদাহ ইবনুল যাররাহকে গিয়ে বললেন, ‘কায়েস এভাবে যদি প্রতিদিনউট ধার করে এন জবাই করতে থাকে, তাহলে তার পিতার সব সম্পদ সে এখানেই শেষ করে দেবে। আপনি তাকে উট জবাই থেকে বারণ করুন।’

আবু উবায়দা (রা) কায়েসকে সে মুতাবিক নির্দেশ দিলেন।

যুদ্ধ থেকে মদীনায় ফেরার পর কায়েস (রা) পিতার কাছে মুসলিম বাহিনীর রসদ সংকট ও দুঃখ-দুর্দশার কথা জানালেন।

পিতা তাকে বলল, তুমি উট যোগাড় করে সকলের জন্যে জবাই করতে পারতে।

কায়েস (রা) বললেন, পর পর তিন দিন আমি তাই করেছি।

কিন্তু আবু বকর (রা) ও উমর (রা) এই কথা বলায় অধিনায়ক আবু উবায়দা (রা) আমাকে উট জবাই করতে বারণ করেন।

ক্ষোভ ও আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়লেন সা‘আদ (রা) ইবনে উবাদাহ।

তিনি ছুটলেন মহানবীর কাছে। মহানবী (সা) তখন বসেছিলেন।

সা‘আদ (রা) তাঁর পেছনে এসে দাঁড়ালেন এবং অভিমান-ক্ষুব্ধ ও আবেগ-জড়িত কণ্ঠে মহানবী (সা)-কে বললেন, “ইবনে আবু কুহাফাহ এবং ইবনে খাত্তাব-এর পক্ষ থেকে কেউ জবাব দিক যে, তারা আমার পুত্রকে কেন বখিল বানাতে চনয়?

ইকরামার ওয়াদা পালন

ইসলাম গ্রহণের সময় ইকরামা বিন আবু জাহ্ল বলেছিলেন, ইসলামের বিরুদ্ধে তিনি যত যুদ্ধ করেছেন, যত যুদ্ধ করেছেন, যত অর্থ খরচ করেছেন, তার দ্বিগুন তিনি খরচ করবেন ইসলামের জন্যে।

আমৃত্যু কথাটা মনে রেখেছেন ইকরামা বিন আবু জাহ্ল।

হযরত আবু বকর (রা)-এর খিলাফতকালে ভণ্ড নবীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ব্যস্ত ছিলেন ইকরামা। এ জন্যে গঠিত ১১টি বাহিনীর একটির সেনাপতি ছিলেন তিনি।

ইয়ামামা থেকে জর্ডান, জর্ডান থেকে ইয়েমেন- এই বিস্তৃত অঞ্চল তিনি যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলেন।

তাঁর বাহিনীর গোটা খরচ তিনি নিজের অর্থ থেকে ব্যয় করেছেন, বায়তুল মাল থেকে তিনি এক পয়সাও নেননি।

ভণ্ড নবীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষে আমর ইবনুল আসের নেতুত্বাধীন সিরিয়াগামী বাহিনীতে শামিল হলেন ইকরামা (রা) একজন সেনাধ্যক্ষ হিসেবে।

সিরিয়াগামী বাহিনী সমবেত হয়েছে মদীনার উপকণ্ঠে।

এ বাহিনীর পরিদর্শনে বেরিয়েছেন আমীরুল মুমিনীন হযরত আবু বকর (রা)।

এক তাঁবু তাঁর দৃষ্টিগোচর হলো যার চারদিকে ঘোড়া আর ঘোড়ার মিছিল।

আর দেখলেন, বর্শা, তরবারী এবং অন্যান্য যুদ্ধ সরঞ্জামের বিশাল স্তূপ সেখানে।

হযরত আবু বকর এলেন সে তাঁবুর কাছে।

উঁকি দিলেন ভেতরে। দেখতে পেলেন ইকরামা (রা)-কে।

তিনি জানতে পারলেন, এসব ঘোড়া ও সরঞ্জারম ইকরামা নিজ অর্থে কিনেছেন যুদ্ধের জন্যে।

হযরত আবু বকর (রা) ইকরামাকে সালাম করলেন এবং বললেন, “ইকরামা তুমি এই যুদ্ধাস্ত্র ও সরঞ্জামাদি ক্রয়ের জন্যে বিপুল অর্থ খরচ করেছো। আমি চাই, এর একটা অংশ বায়তুল মাল থেকে তুমি নাও।”

ইকরামা (রা) আরজ করলেন, “হে খলিফাতুর রাসূল, আমার নিকট এখনও দু’হাজার দিনার নগদ রয়েছে।

আমার সম্পদ আমি আল্লাহর রাস্তায় ওয়ক্ফ করে দিয়েছে। বায়তুল মালের উপর বোঝা আরোপ করা থেকে আমাকে মাফ করুন।”

হযরত আবু বকর (র) আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন।

দু’হাত তুলে তিনি দোয়া করলেন ইকরামার জন্যে।

হযরত আবু বকর (রাঃ) এর অনুশোচনা

এক ব্যক্তি হযরত আবু বকর সিদ্দীক(রা) কে গালি দিচ্ছিল। সেখানে রাসূল(সা) উপস্থিত ছিলেন। আবু বকর(রা) কোনো বাদ প্রতিবাদ না করে নীরবে গালি শুনতে লাগলেন।

কিছুক্ষণ পর তাঁর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল। তিনি ঐ ব্যক্তিতে তারই দেয়া একটি গালি ফেরত দিলেন। তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ(সা) এর মুখে অসন্তোষের চিহ্ন ফুটে উঠল। তিনি উঠে বাড়ীতে চলে গেলেন।

হযরত আবু বকর(রা) ঘাবড়ে গেলেন। তিনি কালবিলম্ব না করে রাসূলুল্লাহ(সা) এর কাছে ছুটে গেলেন এবং বললেন, “হে রাসূল! লোকটি যখন আমাকে গালি দিচ্ছিল আপনি চুপচাপ শুনছিলেন। যেই আমি জবাব দিলাম অমনি অসন্তুষ্ট হয়ে উঠে চলে এলেন।”

রাসূল(সা) বললেন, “শোন আবু বকর, যতক্ষণ তুমি চুপ ছিলে এবং ধৈর্য ধারণ করছিলে, ততক্ষণ তোমার সাথে আল্লাহর একজন ফেরেশতা ছিল, যিনি তোমার পক্ষ হতে জবাব দিচ্ছিলেন। কিন্তু যখন তুমি নিজেই জবাব দিতে শুরু করলে তখন ঐ ফেরেশতা চলে গেলেন এবং মাঝখানে এক শয়তান এসে গেল। সে তোমাদের উভয়ের মধ্যে গোলযোগ তীব্রতম করতে চাইছিল।

হে আবু বকর! মনে রেখ কোনো বান্দার উপর যদি যুলুম ও বাড়াবাড়ি হতে থাকে এবং সে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তা ক্ষমা করতে থাকে এবং কোনো প্রতিশোধ নেয়া হতে বিরত থাকে, তবে আল্লাহ যুলুমকারীর বিরুদ্ধে তাকে সর্বাত্মক সাহায্য করে।”

হযরত আবু বকর(রা) অনুতপ্ত হলেন যে, ধৈর্যহারা হয়ে তিনি আল্লাহর ফেরেশতার সাহায্য হতে বঞ্চিত হয়ে গেলেন।

শিক্ষাঃ

এই ঘটনা আমাদের সামনে ধৈর্যের শিক্ষাই নতুন করে তুলে ধরেছে।

রাসূল(সা) বলেছেনঃ

“ধৈর্য এমন একটা গাছ, যার সারা গায়ে কাঁটা, কিন্তু এর ফল অত্যন্ত মজাদার।”

সুতরাং প্রত্যেক মুসলমানের উচিত চরম উস্কানীর মুখেও ধৈর্য ধারণ করা ও ক্রোধ সম্বরণ করা।

উস্কানীর মুখে ক্রোধ সম্বরণের সহজ পন্থা হলো সালাম দিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করা, নচেত ঠান্ডা পানি দিয়ে ওযূ করা।

হযরত আবু বকরের (রা) জনসেবা

হযরত আবু বকর(রা) কে খলীফা নিযুক্ত করা হয়েছে একথা যখন ঘোষণা করা হলো তখন মহল্লার একটি গরীব মেয়ে অস্থির হয়ে পড়ল।

লোকেরা জিজ্ঞেস করলো যে, আবু বকর(রা) খলীফা হয়েছেন, তাতে তোমার কি অসুবিধা হয়েছে? মেয়েটি বললো, “আমাদের ছাগলগুলোর কী হবে?” জিজ্ঞেস করা হলো, “এর অর্থ?” সে বললো, এখনতো উনি খলীফা হয়ে গেছেন।

আমাদের ছাগল ক’টার দেখাশোনাই বা কে করবে, এগুলোর দুধই বা কে দুইয়ে দিবে? এ কথার কেনো জবাব দেয়া কারো পক্ষেই সম্ভব হলো না। কিন্তু পরদিন খুব ভোরে মেয়েটি অবাক হয়ে দেখলো যে, হযরত আবু বকর(রা) যথাসময়ে তাদের বাড়ি গিয়েছেন এবং দুধ দোহাচ্ছেন।

আর যাওয়ার সময় বলে গেলেন, “মা, তুমি একটুও চিন্তা করো না।

আমি প্রতিদিন এভাবেই তোমার কাজ করে দিয়ে যাবো।” তাবাকাতে ইবনে সাদে আছে যে, মেয়েটির বিচলিত হওয়ার সংবাদ শুনে হযরত আবু বকর(রা) বলেছিলেন, আমি আশা করি খেলাফতের দায়িত্ব আমার আল্লাহর বান্দাদের সেবার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।

আমি এখনো এ দরিদ্র মেয়েটির ছাগল দোহন করে দিয়ে আসবো ইনশাল্লাহ।

ইবনে আসাকার লিখেছেন যে, আবু বকর(রা) খেলাফতের পূর্বে তিন বছর এবং খেলাফতের পরে এক বছর পর্যন্ত মহল্লার দরিদ্র পরিবারগুলির ছাগল দোহন করে দিয়ে আসতেন।

আবু ছালেহ গিফারী বর্ণনা করেন যে, হযরত আবু বকর(রা) যখন খলীফা হন তখন মদীনার এক অন্ধ বুড়ীর বাড়ির কাজকর্ম হযরত ওমর(রা) স্বহস্তে করে দিতেন। তার প্রয়োজনীয় পানি এনে দিতেন ও বাজার সওদা করে দিতেন।

একদিন ওমর সেখানে গিয়ে দেখেন বুড়ীর বাড়ি একদম পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।

কলসিতে পানি আনা হয়েছে, বাজারও করা হয়েছে। তিনি ভাবলেন, বুড়ীর কোনো প্রতিবেশি হয়তো কাজগুলো করে দিয়ে গেছে। পরদিনও দেখলেন একই অবস্থা। সব কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে। এভাবে কয়েকদিন কেটে গেল।

এবার হযরত ওমরের কৌতুহল হলো। ভাবলেন, এই মহানুভব ব্যক্তিটি কে তা না দেখে ছাড়বেন না।

একদিন নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগে এসে লুকিয়ে রইলেন।

দেখলেন অতি প্রত্যুষে এক ব্যক্তি বুড়ীর বাড়ির দিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছেন। হযরত ওমর বুঝতে পারলেন যে, এই ব্যক্তিই সেই মহান ব্যক্তি যিনি তারও আগে এসে বুড়ীর সমস্ত কাজ সেরে দিয়ে যান।

ব্যক্তিটি বুড়ীর ঘরের মধ্যে এসে যখন কাজ শুরু করে দিল তখন হযরত ওমর যেয়ে দেখেন, ইনি আর কেউ নন, স্বয়ং খলীফা হযরত আবু বকর(রা)। হযরত ওমর বললেন, হে রাসূলের প্রতিনিধি!

মুসলিম জাহানের শাসন সংক্রান্ত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এই বুড়ীর তদারকীও চালিয়ে যেতে চান নাকি? হযরত আবু বকর(রা) জবাব না দিয়ে একটু মুচকি হেসে যথারীতি কাজ করতে লাগলেন।

শিক্ষাঃ

সাধারণত উচ্চপদস্থ লোকেরা অন্যের কাজ করা দূরে থাক, নিজের কাজও করতে চায় না। চাকর চাকরানী ও যন্ত্রের মাধ্যমে সব কাজ সারতে চেষ্টা করে। হযরত আবু বাকরের হাতে দাস দাসীর অভাব ছিল না।

উপকারের কাজটা কোনো ভৃত্যকে পাঠিয়ে দিয়েও করাতে পারতেন।

কিন্তু আখেরাতের বাড়তি সাওয়াবের আশায় এবং সাধারণ মুসলমানদের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করার মানসে এভাবে স্বহস্তে অন্যের সেবা করেছেন সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদে আসীন থাকা অবস্থায়।

সকল যুগের মুসলমানদের সকল পর্যায়ের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গের জন্য এটি একটি চমকপ্রদ অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

হযরত আবু বকরের (রাঃ) খোদাভীতি !

সহীহ আল বুখারীতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকর(রা) এর একজন গোলাম ছিল।

সে হযরত আবু বকরকে মুক্তিপণ হিসেবে কিছু অর্থ দেয়ার শর্তে মুক্তি চাইলে তিনি তাতে সম্মত হন।

অতঃপর প্রতিদিন সে তার মুক্তিপণের কিছু অংশ নিয়ে আসতো।

হযরত আবু বকর(রা)তাকে জিজ্ঞেস করতেন, কিভাবে এটা উপার্জন করে এনেছ? সে যদি সন্তোষজনক জবাব দিতে পারত তবে তা গ্রহণ করতেন, নতুবা করতেন না।

একদিন সে রাতের বেলায় তাঁর জন্য কিছু খাবার জিনিস নিয়ে এল। সেদিন তিনি রোযা ছিলেন। তাই তাকে সেই খাদ্যের উৎস সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতে ভুলে গেলেন এবং এক লোকমা খেয়ে নিলেন।

তাঁরপর তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এ খাবার তুমি কিভাবে সংগ্রহ করেছ? সে বললোঃ আমি জাহেলিয়াত আমলে লোকের ভাগ্যগণনা করতাম। আমি ভালো গণনা করতে পারতাম না।

কেবল ধোকা দিতাম। এ খাদ্য সেই ভাগ্যগণনার উপার্জিত অর্থ দ্বারা সংগৃহীত।

হযরত আবু বকর(রা) বললেনঃ কী সর্বনাশ! তুমি তো আমাকে ধ্বংস করে ফেলার উপক্রম করেছ। তারপর গলায় আঙ্গুল ঢুকিয়ে বমি করার চেষ্টা করলেন।

কিন্তু বমিতে খাওয়া জিনিস বেরুলোনা। তখন তিনি পানি চাইলেন।

পানি খেয়ে খেয়ে সমস্ত ভু্ক্ত দ্রব্য পেট থেকে বের করে দিলেন।

লোকেরা বললঃ আল্লাহ আপনার উপর দয়া করুন।

ঐ এক লোকমা খাওয়ার কারণেই কি এত সব? হযরত আবু বকর(রা) বললেনঃ ঐ খাদ্য বের করার জন্য যদি আমাকে মৃত্যুবরণও করতে হতো, তবুও আমি বের করে ছাড়তাম।

কেননা আমি শুনেছি, রাসূল(সা) বলেছেনঃ “যে দেহ হারাম খাদ্য দ্বারা গড়ে ওঠে তার জন্য দোযখের আগুনই উত্তম।”

তাই আমি আশংকা করেছিলাম যে এই এক লোকমা খাদ্য দ্বারা আমার শরীরের কিছু অংশ গঠিত হতে পারে।

শিক্ষাঃ

আখিরাতের কঠিন ও অবধারিত শাস্তির কথা মনে রেখে সব সময় হালাল হারাম বাছ বিচার করে চলা প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য।

খলিফা আবু বকর ছিদ্দীক (রা) আখলাক

হযরত আবু বকর ছিদ্দীক(রা) যেদিন খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন সেদিনই সকালে কাপড়ের বড় একটা পুটলি মাথায় করে বাড়ি থেকে বেরুলেন।

পথে হযরত ওমরের সাথে তার দেখা হলো।

ওমর জিজ্ঞাসা করলেন, ওহে রাসূলুল্লাহর খলীফা, আপনি কোথায় চলেছেন?

হযরত আবু বকর বললেন, বাজারে।

হযরত ওমর বললেন, আপনি মুসলমানদের শাসনভার গ্রহণ করেছেন।

এখন বাজারে আপনার কি কাজ?

আবু বকর বললেন, বাজারে না গেলে আমার ছেলেমেয়েকে খাওয়াবো কোত্থেকে?

নিজের ছেলেমেয়েদের যদি আমি খাবার দিতে না পারি তাহলে গোটা দেশের মুসলমানদেরও তো আমি খাবার দিতে পারবো না।

ওমর বললেন, চলুন, মসজিদে নববীতে যাই।

সবার সাথে আলোচনা করে আপনার ও আপনার পরিবারের খোরপোশের কি ব্যবস্থা করা যায়, যাতে আপনি দেশের কল্যাণ সাধন ও খিলাফতের দায়িত্ব পালনে একাগ্রচিত্তে কাজ করতে পারেন।

মসজিদে গিয়ে আবু বকর ও ওমর বাইতুল মালের সচিব আবু ওবায়দা ইবনুল জাররাহ ও আরো কিছু সংখ্যক সাহাবীর সঙ্গে বৈঠকে বসলেন এবং ওমর তাঁর অভিমত প্রকাশ করলেন।

তখন সকলে আবু বকর ও তাঁর পরিবারের জন্য প্রচলিত নিয়েমে যতটা দরকার খোরপোষ বরাদ্দ করলেন।

শিক্ষাঃ

মুসলমানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরকে এরূপ বেতনভাতা দেওয়া উচিত, যাতে তারা মৌলিক প্রয়োজনের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থেকে একাগ্রচিত্তে কাজ করতে পারেন এবং কোনো দুর্নীতিতে লিপ্ত হতে বাধ্য না হন।

আবু বকরকে (রাঃ) কোনদিন ছাড়িয়ে যেতে পারবোনা, আবু বকর (রা:) তাঁর অতুলনীয় বিশ্বাসপরায়ণতার জন্যে উপাধি পেয়েছিলেন আস সিদ্দিক। শুধু বিশ্বাস ও আমলেই নয়, দানশীলতার ক্ষেত্রেও তাঁর কোন তুলনা ছিল না।

উমার ইবনে খাত্তাব(রা:) বলেছেন,

তাবুক যুদ্ধের প্রাক্কালে মহানবী(সা:) আমাদের যার যা আছে তা থেকে যুদ্ধ তহবিলে দান করার আহবান জানালেন।

এ আহবান আমি নিজে নিজেকে বললাম, “আমি যদি আবু বকরকে অতিক্রম করতে পারি তাহলে আজই সেই দিন।”

এই চিন্তা করে আমি আমার সম্পদের অর্ধেক মহানবীর(সা:) খেদমতে হাজির করলাম।

আল্লাহর রাসুল জিজ্ঞাসা করলেন, “পরিবারের জন্য তুমি কি রেখেছ ?”

বললাম, “যেই পরিমাণ এনেছি সেই পরিমাণ রেখে এসেছি।”

এরপর আবু বকর তাঁর দান নিয়ে হাজির হলেন।

মহানবী(সা:) ঠিক ঐভাবেই তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আবু বকর,পরিবারের জন্য কি অবশিষ্ট আছে?”

আবু বকর জবাব দিলেন,

“তাদের জন্য আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসুল রয়েছেন।”

আমি আগের মত করেই বললাম “কোন ব্যাপারেই আবু বকরকে কোন দিন ছাড়িয়ে যেতে পারবোনা।”

মদিনা হিংস্র জন্তুর শিকারে পরিণত হয় হোক

মহানবীর(সাঃ) মৃত্যুর পর আবু বকর(রাঃ) খলিফা নির্বাচিত হলেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে মহানবী(সাঃ) সিরিয়ায় একটি অভিযান প্রেরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় সেই মুহূর্তে তা স্থগিত হয়ে যায়। কিন্তু আবু বকর(রাঃ) খলিফা হয়েই সেই অভিযান প্রেরণের উদ্যোগ নিলেন। মুসলিম নেতৃবিন্দের অনেকেই এর সাথে দ্বিমত পোষণ করলেন এই বলে যে, মদিনা অরক্ষিত হয়ে পড়লে মহানবীর(সাঃ) মৃত্যুর সুযোগ নিয়ে গোলযোগকারী যারা মাথা তুলতে চাচ্ছে, তারা সুযোগ পেয়ে যেতে পারে।

জবাবে খলিফা আবু বকর(রাঃ) বললেন, মহানবীর(সাঃ) কোন সিদ্ধান্তকে আমি অমান্য করতে পারবো না। মদিনা হিংস্র বন্য জন্তুর শিকারে পরিণত হয় হোক, কিন্তু সেনাবাহিনীকে তাদের মৃত মহান নেতার ইচ্ছা পূরণ করতেই হবে। হযরত আবু বকরের(রাঃ) প্রেরিত এই অভিযান ছিল সিরিয়া, পারস্য ও উত্তর আফ্রিকায় ইসলামের বিজয় অভিযানের মিছিলে প্রথম গৌরবোজ্জ্বল অভিযাত্রা। অভিযাত্রা সফল হয়েছিল। দেড়মাস পর সেনাপতি উসামা বিজয়ীর বেশে মদিনায় ফিরে এসেছিলেন।—–#—–

হযরত আবু বকরের (রাঃ) অন্তিম অসিয়ত ও উপদেশ

ইসলামের প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর(রা) এর জীবনের অন্তিম ও প্রধান কাজ হলো পরবর্তী খলীফা হিসেবে হযরত উমারকে নিযুক্তি দান।

আহলে রায় অনেকের সাথে তিনি এ ব্যাপারে পরামর্শ করেন এবং অবশেষে হযরত উসমান (রাঃ) কে ডেকে এ সম্পর্কে ওসিয়ত ও উপদেশ লিপিবদ্ধ করেন। সেই ঐতিহাসিক দলিলটি এইঃ

“পরম দয়ালু ও মেহেরবান আল্লাহর নামে, আল্লাহর দাস ও মুসলমানদের নেতা আবু কুহাফার পুত্র আবু বকর তাঁর ইন্তিকালের মুহূর্তে তাঁর পরবর্তী খলীফা ও মুসলমানদের উদ্দেশ্যে এই ওসিয়তনামা লিপিবদ্ধ করছেন এবং স্মরণ করাচ্ছেন যে, মৃত্যুকাল এমনই এক কঠিন সময় যে সময়ের কষ্ট ও ভয়াবহতায় অভিভূত হয়ে কাফেরও মুমিন হতে চায়, চরিত্রহীন ব্যক্তি চরিত্রবান হতে চায় এবং মিথ্যাচারী সত্যের আশ্রয় গ্রহণের জন্যে হয়ে ওঠে ব্যাকুল।

মুসলমানগণ! আমি আমার পরে খাত্তাবের পুত্র উমারকে তোমাদের জন্য খলীফা নিযুক্ত করছি।

তিনি যতদিন কুরআন ও রাসুলের নীতি অনুযায়ী চলবেন ও তোমাদের সেই আদর্শ অনুযায়ী পরিচালিত করবেন, তোমরা দ্বিধা শূন্য চিত্তে তাঁর আনুগত্য করবে।

আল্লাহ ও রাসুল এবং তাঁদের মনঃপুত ইসলাম ও মুসলমান এবং মানবজাতি সম্বন্ধে আমার উপর যে গুরুদায়িত্ব অর্পিত ছিল, তা আমি উপযুক্ত ব্যক্তির উপর ন্যস্ত করে কর্তব্য সম্পাদনের চেষ্টা করেছি।

আমার বিশ্বাস, উমার নিরপেক্ষভাবে শাসনদণ্ড পরিচালনা করে ইসলামের গৌরব বৃদ্ধি করবেন। কিন্তু এর ব্যতিক্রমের দায়িত্ব তাঁর নিজের, কারণ আমি তাঁর বর্তমান ও অতীত জীবনের পরিচয়ের উপর নির্ভর করে তাঁকে আমার স্থলাভিষিক্ত করেছি, কিন্তু ভবিষ্যতের দায়িত্ব আমার নয়। কারণ আমি অন্তর্যামী নই।

তবে এ কথা তাঁকে আমি অবশ্যই স্মরণ করাচ্ছি যে, যদি তিনি নিজের রূপ ও আচরণের পরিবর্তন করেন যা ইসলাম মুসলমানদের জন্য ক্ষতিকর ও গ্লানিকর হতে পারে, তবে তার বিষময় ফল অবশ্যই তাঁকে ভোগ করতে হবে। তোমাদের সকলের কল্যাণ হোক।”

ওসিয়তনামা লেখা শেষ হলে তা সীলমোহর করে হযরত উমারকে ডেকে আবু বকর(রা) তাঁকে এই উপদেশ দিলেনঃ

“খাত্তাবের পুত্র উমার! আমি তোমাকে যাঁদের জন্য খলীফা মনোনীত করছি তাঁদের মধ্যে আল্লাহর প্রিয় নবীর সাহাবাবৃন্দও রয়েছেন। আশা করি এর গুরুত্ব তুমি সম্যক উপলব্ধি করবে।

এই গুরুদায়িত্ব পালনে আমি তোমাকে আল্লাহভীতি সম্বল করতে উপদেশ দিচ্ছি। কারণ যার অন্তর সর্বদা আল্লাহর নিকট জওয়াবদিহির দায়িত্ব স্মরণ করে ভীত হয়, সে ব্যক্তি কখনই অন্যায় কাজে লিপ্ত হতে পারে না।

মানুষের মধ্যে সেই ব্যক্তিই ভাগ্যবান যিনি লোভমুক্ত হয়েছেন এবং স্বীয় কর্তব্য নির্ধারণপূর্বক যথা সময়ে তা পালন করতে তৎপর হয়েছেন। সুতরাং তুমি কখনই দিনের করনীয় রাতের জন্য অথবা রাতের করনীয় দিনের জন্য ফেলে রাখবে না এবং কাজের গুরুত্ব ও লঘুত্ব উপলব্ধি করে সর্বাগ্রে গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলী সমাধা করবে।

মনে রেখো, যে ব্যক্তি ফরজ কাজ ফেলে রেখে নফলকে গুরুত্ব দান করে, তার কাজ ততক্ষণ আল্লাহ কর্তৃক গৃহীত হয় না, যতক্ষণ সে ফরযের গুরুত্ব বুঝে তা সম্পাদন না করে।

সকল মানুষকে সমান দৃষ্টিতে দেখা এবং শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে নিরপেক্ষভাবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাতেই ইসলামের মহিমা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি। আরও জেনে রাখো, যে ব্যক্তি সত্য ও ন্যায় বিচারকে প্রাণাপেক্ষাও ভালবেসে ইহলোকে কর্তব্য সম্পাদন করেছে, কিয়ামতের দিন তারই পুণ্যের পাল্লা ভারী হবে।

কিন্তু যারা ইহলোকে মিথ্যার তাঁবেদারি করে অন্যায়, অত্যাচার ও অনাচারে লিপ্ত হয়েছে, পরলোকে তাদের পুণ্যের পাল্লা শোচনীয়ভাবে হাল্কে হয়ে পড়বে।

হে উমার! আল্লাহ কি কুরআনে এক সঙ্গে অনুগ্রহ ও নিগ্রহ এবং পুরস্কার ও শাস্তির বর্ণনা করেছেন, তার মর্ম উপলব্ধির চেষ্টা করবে। এর মর্ম হচ্ছে এই যে, মুমিনরা আশা ও নিরাশার মধ্য থেকে কর্তব্য নির্ধারণ করতে সমর্থ হবে। সুতরাং তুমি এরূপ কোন অন্যায় লোভ এবং আশায় ক্খনই অভিভূত হবে না, যে আশা তোমাকে লক্ষ্যচ্যুত করতে পারে। আবশ্যকের অতিরিক্ত বস্তুর আকাঙ্ক্ষা কখনই করবেনা। আবার নিজের জন্যে যা অপরিহার্য তা কখনই বিনা কারণে ত্যাগ করবে না।

হে উমার! আল্লাহ সেই সব অসৎ লোকদের জন্য জাহান্নামের ব্যবস্থা করেছেন, জাদের দুষ্কর্ম এতদুর সীমা লঙ্ঘন করেছে যে, আল্লাহ তাদের সৎকর্মসমূহ দূরে নিক্ষেপ করেছেন। অতএব তুমি যখন দোযখ বাসীদের সম্পর্কে আলোচনা করবে, তখন নিজের সম্বন্ধে এটুকুই বলবে যে, ‘আশা করি আল্লাহর অনুগ্রহে আমি তাদের (জাহান্নাম বাসীদের) দলভুক্ত হব না।

’ আল্লাহ সৎকর্মশীলদের জন্যই অনন্ত সুখের জান্নাতের ব্যবস্থা করেছেন। অতএব তুমি যখন পুণ্যাত্মা জান্নাতবাসীদের প্রসঙ্গ উত্থাপন করবে, তখন নিজের সম্বন্ধে এই ভাব প্রকাশ করবে যে, হে আল্লাহ, তুমি আমার অন্তরে এরূপ সৎকর্মের প্রেরণা দান কর, যার দ্বারা আমি জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি।

“হে উমার, যদি তুমি আমার এই উপদেশগুলি কার্যকর করতে চাও, তবে যে মৃত্যু প্রত্যেক জীবের জন্য এবং তোমার জন্যও অবধারিত রয়েছে , তাকেই সর্বাপে

মহানবীর দর্শন ঘাতককে করল বিহবল

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) হিজরত করছেন মদিনা। চলছেন পথ ধরে। পূর্ব দিগন্ত তখনও সফেদ হয়ে উঠেনি। তিনটি উট এবং চার জন মানুষের (মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) , আবু বকর (রাঃ) এবং আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকাত (রাঃ) ছাড়াও আমের এই কাফেলায় শামিল ছিলেন।) ছোট্ট কাফিলা মদিনার পথে চলছে। আবু বকরের (রাঃ)র কাছ থেকে কেনা ‘কাছওয়া’ নামক উটে।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) , আমের এবং হযরত আবু বকর()রাঃ) আসীন আবু বকরের (রাঃ)’র উটে এবং আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকাত (রাঃ) তাঁর নিজস্ব উটে।

দ্রুত পথ অতিক্রম করছে কাফিলাটি। ডাইনে লোহিত সাগর, বামে অন্তহীন পাহাড়ের শ্রেণী, মাঝখানের মরুপথ ধরে এগিয়ে চলছে কাফেলা।

যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কাফিলা সাওর গিরিগুহা থেকে বের হলে যাত্রার দৃশ্য একজন পল্লিবাসী আরবের চোখে পড়ে গেল।

ঐ আরব তার গোত্রের এক জমায়েতে গিয়ে এই খবর দিয়ে বলল, “আমার মনে হচ্ছে কুরাইশরা ওদেরকেই খুঁজছে।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও আবু বকরকে (রাঃ) কে হত্যা করতে পারলে একশ উট পাওয়া যাবে।”

এ খবর পল্লীতেও এসেছিল। সুতরাং ঐ খবরটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত সুরাকা নামক জনৈক যুবক গোটা পুরষ্কার নিজে হাত করার লোভে বলল, ‘না না তারা সে লোক নয়।

আমি জানি তারা অমুক অমুক লোক, উট খুঁজতে বেরিয়েছে।’

সুরাকার কথা সকলে সত্য বলে ধরে নিয়ে যখন অন্য আলোচনায় মশগুল হয়ে পড়ল, তখন সুরাকা ধীরে ধীরে মজলিস থেকে বের হয়ে এলো।

তারপর অস্ত্র-সজ্জিত হয়ে বলবান ঘোড়া নিয়ে মহানবী (সাঃ) এবং আবু বকরকে (রাঃ) কে হত্যার জন্য বেরিয়ে পড়ল।

দেরী সহ্য হচ্ছিল না সুরাকার। উঁচু নিচু পাথর পথে তীব্র বেগে ঘোড়া ছুটাল সুরাকা। দূরে দেখতে পেল সেই কাফেলাকে।

সুরাকার ঘোড়ার গতি আরও বেড়ে গেল। কিন্তু ঘোড়া মারাত্মকভাবে পা পিছলে পড়তে পড়তে বেঁচে গেল। সুরাকার মনে ভীষণভাবে খোঁচা লাগল। লক্ষ্যের সাফল্য সম্পর্কে তার মনে সন্দেহের দোলা লাগলো।

সে আরবিয় রীতি তীর দিয়ে লটারি করলো। তাতে না সূচক জবাব পেয়ে সে ভীষণ দমে গেল। কিন্তু তা মুহূর্তের জন্য। তারপর লটারি ভুল হয়েছে ধরে নিয়ে সে আবার তীরবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। আবু বকরের সন্ধানী চোখ এই সময় সুরাকাকে দেখতে পেল। তিনি উদ্বিগ্নভাবে নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে বললেন, “দেখুন, আততায়ী এবার আমাদের ধরে ফেলেছে।”

নিরুদ্বিগ্ন কণ্ঠে আবু বকরকে (রাঃ)কে সান্ত্বনা দিয়ে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বললেন, “ভীত হয়ো না আবু বকর (রাঃ), আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।”

তীব্র বেগে ছুটছে সুরাকার ঘোড়া। কাফিলাকে সে ধরে ফেলেছে প্রায়। বাঁধনহীন উৎসাহ উত্তেজনায় সুরাকা তখন উন্মত্ত।

চলার পথে সুরাকার ঘোড়া আবার দুর্ঘটনায় পড়ল। এবার ঘোড়ার দুটি পা মাটিতে দেবে গেল। পা দুটি তোলার অনেক চেষ্টা করল সুরাকা, কিন্তু পারল না। এই সময় আগের লটারির ফল তার মনে পড়ল। মনটা তার ভীষণ দমে গেল। আবার তীর বের করে সতর্কতার সাথে সেই লটারিই পুনরায় করল। কিন্তু এবারো সেই উত্তর ‘না’। সুরাকার মন এবার ভীতি অনুভব করল।

অপর দিকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)এর অবিচল, নিরুদ্বিগ্ন এবং শান্ত সৌম্য অবস্থা সুরাহাকে বিহবল করে তুলল। সুরাকা নিজেই বলেছে, তখনকার অবস্থা দেখে আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাল, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) নিশ্চয়ই জয়যুক্ত হবেন।

সুরাকা যখন ভীত বিহবলতায় কাতর, তখন তার ঘোড়া নিজেকে উদ্ধারের জন্য অবরাম চিৎকার করছে আর পা ছুড়ছে।

এই অবস্থায় সুরাকা নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)এর কাফেলাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “হে মক্কার সওয়ারগণ, একটু দাঁড়াও। আমি সুরাকা, আমার কিছু কথা আছে, কোন অনিষ্টের ভয় নেই।”

সুরাকা অতঃপর নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)এর কাছে পৌঁছে নিজের সব কথা খুলে বলে আরজ করল, আমার খাদ্য সম্ভার ও অস্ত্র-শস্ত্র আপনারা গ্রহণ করুন।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তার দান গ্রহণ না করে মিষ্টি কথায় বললেন, “এ সবের কোন আবশ্যকতা আমাদের নেই।আমাদের কথা কাউকে বলে না দিলেই উপকৃত হব।”

সুরাকা তখন আরজ করলো, আমার জন্য আপনি একটা পরওয়ানা লিখে দিন, “যা প্রদর্শন করে আমি উপকৃত হতে পারব।” মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আমেরকে বলে চামড়ায় ঐ ধরণের একটি পরওয়ানা লিখে দিলেন।

অতঃপর সুরাকা ফিরে গেল। মহানবীর কাফিলা আবার যাত্রা করলো মদিনার পথে।

আমি ঠকিনি বন্ধু’

মক্কার ধনী উমাইয়া।ধনে-মনে সব দিক দিয়েই কুরাইশদের একজন প্রধান ব্যক্তি সে। প্রাচুর্যের যেমন তার শেষ নেই, ইসলাম বিদ্বেষেও তা কোন জুড়ি নেই। শিশু ইসলামকে ধ্বংসের কোন চেষ্টারই সে কোন ত্রুটি করে না।

এই ঘোরতর ইসলাম বৈরী উমাইয়ার একজন ক্রীতদাস ইসলাম গ্রহন করেছে। তা জানতে পারল উমাইয়া। জানতে পেরে ক্রোধে ফেটে পড়লো সে। অকথ্য নির্যাতন সে শুরু করলো। প্রহারে জর্জরিত সংজ্ঞাহীন-প্রায় ক্রীতদাসকে সে নির্দেশ দেয়, “এখনও বলি, মুহাম্মাদের ধর্ম ত্যাগ কর। নতুবা তোর রক্ষা নেই।”

কিন্তু তার ক্রীতদাস বিশ্বাসে অটল। শত নির্যাতন করেও তাঁর বিশ্বাসে বিন্দুমাত্র ফাটল ধরানো গেল না। ক্রোধে উন্মাদ হয়ে পড়ল উমাইয়া। শাস্তির আরো কঠোরতর পথ অনুসরণ করল সে।

একদিনের ঘটনা। আরব মরুভূমির মধ্যাহ্ন। আগুনের মত রৌদ নামছে আকাশ থেকে। মরুভূমির বালু যেন টগবগিয়ে ফুটছে। উমাইয়া তার ক্রীতদাস্কে নির্দয় প্রহার করল। তারপর তাকে সূর্যমুখী করে শুইয়ে দেওয়া হল। ভারি পাথর চাপিয়ে দেওয়া হল বুকে।

ক্রীদাসের মুখী কোন অনুনয়-বিনয় নেই। মনে নেই কোন শংকা। ছোখে কোন অশ্রু নেই, মুখে কোন আর্তনাদও নেই। উর্ধমুখী তাঁর প্রসন্ন মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে আল্লাহর প্রসংসা ধ্বনি-‘আহাদ’, ‘আহাদ’।

ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন হযরত আবু বকর (রা)। ‘আহাদ’ ‘আহাদ’ শব্দ তাঁর কানে গেল। অনুসন্ধিৎসু হয়ে শব্দ লক্ষ্যে তিনি মরুভূমির বুকে শায়িত ক্রীতদাসের সমীপবর্তী হলেন। উমাইয়াকে দেখে সব ব্যাপারটাই তিনি মনে মনে বুঝে নিলেন।

বললেন, “উমাইয়া, আপনাকে তো ধনী ও বিবেচক লোক বলেই জানতাম। কিন্তু আজ প্রমাণ পেলাম, আমার ধারণা ঠিক নয়। দাসটি যদি এতই না পছন্দ, তাকে বিক্রি করে দিলেই পারেন। এমন নির্দয় আচরন কি মানুষের অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করা হতো। মক্কা বিজয় পর্যন্ত ইসলামের প্রতি তিনি আকৃষ্ট না হলেও

পুত্র আবু বকরকে ইসলাম থেকে ফিরিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন- এমন কোন প্রমাণ ইতিহাসে পাওয়া যায় না। অবশ্য হযরত আলীকে রা. তিনি দেখলে মাঝে মধ্যে বলতেনঃ ‘এই ছোকরারাই আমার ছেলেটিকে বিগড়ে দিয়েছে।’

মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহর সা. খিদমতে হাজির হয়ে ইসলামের ঘোষণা দেন। হিজরী ১৪ সনে প্রায় এক শ’ বছর বয়সে ইনতিকাল করেন। শেষ বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন।

হযরত আবু বকরের মা উম্মুল খায়ের স্বামীর বহু পূর্বে মক্কায় ইসলামের প্রথম পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। মক্কার ‘দারুল আরকামে’ ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে তিনি অন্যতম। স্বামীর মত তিনিও দীর্ঘজীবন লাভ করেন। প্রায় ৯০ বছর বয়সে ছেলেকে খিলাফতের পদে অধিষ্ঠিত রেখে ইহলোক ত্যাগ করেন।

আবু বকর ছিলেন পিতার একমাত্র পুত্র সন্তান। অত্যন্ত আদর যত্ন ও বিলাসিতার মধ্যে পালিত হন। শৈশব থেকে যৌবনের সূচনা পর্যন্ত পিতার উপর নির্ভরশীল ছিলেন। বিশ বছর বয়সে পিতার ব্যবসা বাণিজ্যের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন।

শৈশব থেকে রাসূলুল্লাহর সা. সংগে আবু বকরের বন্ধুত্ব ছিল।

তিনি রাসূলুল্লাহর সা. অধিকাংশ বাণিজ্য সফরের সংগী ছিলেন। একবার রাসূলুল্লাহর সা. সংগে ব্যবসায় উপলক্ষে সিরিয়া যান। তখন তাঁর বয়স প্রায় আঠারো এবং রাসূলুল্লাহর সা. বয়স বিশ। তাঁরা যখন সিরিয়া সীমান্তে, বিশ্রামের জন্য রাসূল সা. একটি গাছের নীচে বসেন। আবু বকর একটু সামনে এগিয়ে এদিক ওদিক দেখতে লাগলেন।

এক খৃস্টান পাদ্রীর সাথে তাঁর দেখা হয় এবং ধর্ম বিষয়ে কিছু কথাবার্তা হয়। আলাপের মাঝখানে পাদ্রী জিজ্ঞেস করে, ওখানে গাছের নীচে কে? আবু বকর বললেন, এক কুরাইশ যুবক, নাম মুহাম্মাদ বিন আবদিল্লাহ।

পাদ্রী বলে উঠলো, এ ব্যক্তি আরবদের নবী হবেন। কথাটি আবু বকরের অন্তরে গেঁথে যায়। তখন থেকেই তাঁর অন্তরে রাসূলুল্লাহর সা. প্রকৃত নবী হওয়া সম্পর্কে প্রত্যয় দৃঢ় হতে থাকে। ইতিহাসে এ পাদ্রীর নাম ‘বুহাইরা’ বা ‘নাসতুরা’ বলে উল্লেখিত হয়েছে।

রাসূলুল্লাহর সা. নবুওয়াত লাভের ঘোষণায় মক্কায় হৈ চৈ পড়ে গেল। মক্কার প্রভাবশালী ধনী নেতৃবৃন্দ তাঁর বিরোধিতায় কোমর বেঁধে লেগে যায়। কেউবা তাঁকে মাথা খারাপ, কেউবা জীনে ধরা বলতে থাকে।

নেতৃবৃন্দের ইংগিতে ও তাদের দেখাদেখি সাধারণ লোকেরাও ইসলাম থেকে দূরে সরে থাকে। কুরাইশদের ধনবান ও সম্মানী ব্যক্তিদের মধ্যে একমাত্র আবু বকর রাসূলুল্লাহকে সা. সংগ দেন, তাঁকে সাহস দেন এবং বিনা দ্বিধায় তাঁর নবুওয়াতের প্রতি ঈমান আনেন।

এই প্রসংগে রাসূল সা. বলেছেনঃ ‘আমি যাকেই ইসলামের দাওয়াত দিয়েছি, একমাত্র আবু বকর ছাড়া প্রত্যেকের মধ্যে কিছু না কিছু দ্বিধার ভাব লক্ষ্য করেছি।’ এভাবে আবু বকর হলেন বয়স্ক আযাদ লোকদের মধ্যে প্রথম মুসলমান।

মুসলমান হওয়ার পর ইসলামের ভিত্তি সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সাথে দাওয়াতী কাজে আত্মনিয়োগ করেন। মক্কার আশপাশের গোত্রসমূহে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। হজ্জ্বের মওসুমে বিভিন্ন তাঁবুতে গিয়ে লোকদের দাওয়াত দিতেন।

বহিরাগত লোকদের কাছে ইসলামের ও রাসূলের সা. পরিচয় তুলে ধরতেন।

এভাবে আরববাসী রাসূলুল্লাহর সা. প্রচারিত দ্বীন সম্পর্কে অবহিত হয়ে তাঁর ওপর ঈমান আনে।

তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাব ও চেষ্টায় তৎকালীন কুরাইশ বংশের বিশিষ্ট যুবক উসমান, যুবাইর, আবদুর রহমান, সা’দ ও তালহার মত ব্যক্তিরা সহ আরো অনেকে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

রাসূলুল্লাহ সা. যখন নবুওয়াতের প্রকাশ্য ঘোষণা দিলেন, আবু বকরের নিকট তখন চল্লিশ হাজার দিরহাম।

ইসলামের জন্য তিনি তাঁর সকল সম্পদ ওয়াক্‌ফ করে দেন। কুরাইশদের যেসব দাস-দাসী ইসলাম গ্রহণের কারণে নিগৃহীত ও নির্যাতিত হচ্ছিল, এ অর্থ দ্বারা তিনি সেই সব দাস-দাসী খরীদ করে আযাদ করেন।

তেরো বছর পর যখন রাসূলুল্লাহর সা. সাথে তিনি মদীনায় হিজরাত করেন তখন তাঁর কাছে এ অর্থের মাত্র আড়াই হাজার দিরহাম অবশিষ্ট ছিল। অল্পদিনের মধ্যে অবশিষ্ট দিরহামগুলিও ইসলামের জন্য ব্যয়িত হয়।

বিলাল, খাব্বাব, আম্মার, আম্মারের মা সুমাইয়্যা, সুহাইব, আবু ফুকাইহ প্রমুখ দাস-দাসী তাঁরই অর্থের বিনিময়ে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি লাভ করেন। তাই পরবর্তীকালে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেনঃ আমি প্রতিটি মানুষের ইহসান পরিশোধ করেছি।

কিন্তু আবু বকরের ইহসানসমূহ এমন যে, তা পরিশোধ করতে আমি অক্ষম।

তার প্রতিদান আল্লাহ দেবেন।

তার অর্থ আমার উপকারে যেমন এসেছে, অন্য কারো অর্থ তেমন আসেনি।অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করা হতো। মক্কা বিজয় পর্যন্ত ইসলামের প্রতি তিনি আকৃষ্ট না হলেও

পুত্র আবু বকরকে ইসলাম থেকে ফিরিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন- এমন কোন প্রমাণ ইতিহাসে পাওয়া যায় না। অবশ্য হযরত আলীকে রা. তিনি দেখলে মাঝে মধ্যে বলতেনঃ ‘এই ছোকরারাই আমার ছেলেটিকে বিগড়ে দিয়েছে।’

মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহর সা. খিদমতে হাজির হয়ে ইসলামের ঘোষণা দেন। হিজরী ১৪ সনে প্রায় এক শ’ বছর বয়সে ইনতিকাল করেন। শেষ বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন।

হযরত আবু বকরের মা উম্মুল খায়ের স্বামীর বহু পূর্বে মক্কায় ইসলামের প্রথম পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। মক্কার ‘দারুল আরকামে’ ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে তিনি অন্যতম। স্বামীর মত তিনিও দীর্ঘজীবন লাভ করেন। প্রায় ৯০ বছর বয়সে ছেলেকে খিলাফতের পদে অধিষ্ঠিত রেখে ইহলোক ত্যাগ করেন।

আবু বকর ছিলেন পিতার একমাত্র পুত্র সন্তান। অত্যন্ত আদর যত্ন ও বিলাসিতার মধ্যে পালিত হন। শৈশব থেকে যৌবনের সূচনা পর্যন্ত পিতার উপর নির্ভরশীল ছিলেন। বিশ বছর বয়সে পিতার ব্যবসা বাণিজ্যের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন।

শৈশব থেকে রাসূলুল্লাহর সা. সংগে আবু বকরের বন্ধুত্ব ছিল।

তিনি রাসূলুল্লাহর সা. অধিকাংশ বাণিজ্য সফরের সংগী ছিলেন। একবার রাসূলুল্লাহর সা. সংগে ব্যবসায় উপলক্ষে সিরিয়া যান। তখন তাঁর বয়স প্রায় আঠারো এবং রাসূলুল্লাহর সা. বয়স বিশ। তাঁরা যখন সিরিয়া সীমান্তে, বিশ্রামের জন্য রাসূল সা. একটি গাছের নীচে বসেন। আবু বকর একটু সামনে এগিয়ে এদিক ওদিক দেখতে লাগলেন।

এক খৃস্টান পাদ্রীর সাথে তাঁর দেখা হয় এবং ধর্ম বিষয়ে কিছু কথাবার্তা হয়। আলাপের মাঝখানে পাদ্রী জিজ্ঞেস করে, ওখানে গাছের নীচে কে? আবু বকর বললেন, এক কুরাইশ যুবক, নাম মুহাম্মাদ বিন আবদিল্লাহ।

পাদ্রী বলে উঠলো, এ ব্যক্তি আরবদের নবী হবেন। কথাটি আবু বকরের অন্তরে গেঁথে যায়। তখন থেকেই তাঁর অন্তরে রাসূলুল্লাহর সা. প্রকৃত নবী হওয়া সম্পর্কে প্রত্যয় দৃঢ় হতে থাকে। ইতিহাসে এ পাদ্রীর নাম ‘বুহাইরা’ বা ‘নাসতুরা’ বলে উল্লেখিত হয়েছে।

রাসূলুল্লাহর সা. নবুওয়াত লাভের ঘোষণায় মক্কায় হৈ চৈ পড়ে গেল। মক্কার প্রভাবশালী ধনী নেতৃবৃন্দ তাঁর বিরোধিতায় কোমর বেঁধে লেগে যায়। কেউবা তাঁকে মাথা খারাপ, কেউবা জীনে ধরা বলতে থাকে।

নেতৃবৃন্দের ইংগিতে ও তাদের দেখাদেখি সাধারণ লোকেরাও ইসলাম থেকে দূরে সরে থাকে। কুরাইশদের ধনবান ও সম্মানী ব্যক্তিদের মধ্যে একমাত্র আবু বকর রাসূলুল্লাহকে সা. সংগ দেন, তাঁকে সাহস দেন এবং বিনা দ্বিধায় তাঁর নবুওয়াতের প্রতি ঈমান আনেন।

এই প্রসংগে রাসূল সা. বলেছেনঃ ‘আমি যাকেই ইসলামের দাওয়াত দিয়েছি, একমাত্র আবু বকর ছাড়া প্রত্যেকের মধ্যে কিছু না কিছু দ্বিধার ভাব লক্ষ্য করেছি।’ এভাবে আবু বকর হলেন বয়স্ক আযাদ লোকদের মধ্যে প্রথম মুসলমান।

মুসলমান হওয়ার পর ইসলামের ভিত্তি সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সাথে দাওয়াতী কাজে আত্মনিয়োগ করেন। মক্কার আশপাশের গোত্রসমূহে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। হজ্জ্বের মওসুমে বিভিন্ন তাঁবুতে গিয়ে লোকদের দাওয়াত দিতেন।

বহিরাগত লোকদের কাছে ইসলামের ও রাসূলের সা. পরিচয় তুলে ধরতেন।

এভাবে আরববাসী রাসূলুল্লাহর সা. প্রচারিত দ্বীন সম্পর্কে অবহিত হয়ে তাঁর ওপর ঈমান আনে।

তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাব ও চেষ্টায় তৎকালীন কুরাইশ বংশের বিশিষ্ট যুবক উসমান, যুবাইর, আবদুর রহমান, সা’দ ও তালহার মত ব্যক্তিরা সহ আরো অনেকে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

রাসূলুল্লাহ সা. যখন নবুওয়াতের প্রকাশ্য ঘোষণা দিলেন, আবু বকরের নিকট তখন চল্লিশ হাজার দিরহাম।

ইসলামের জন্য তিনি তাঁর সকল সম্পদ ওয়াক্‌ফ করে দেন। কুরাইশদের যেসব দাস-দাসী ইসলাম গ্রহণের কারণে নিগৃহীত ও নির্যাতিত হচ্ছিল, এ অর্থ দ্বারা তিনি সেই সব দাস-দাসী খরীদ করে আযাদ করেন।

তেরো বছর পর যখন রাসূলুল্লাহর সা. সাথে তিনি মদীনায় হিজরাত করেন তখন তাঁর কাছে এ অর্থের মাত্র আড়াই হাজার দিরহাম অবশিষ্ট ছিল। অল্পদিনের মধ্যে অবশিষ্ট দিরহামগুলিও ইসলামের জন্য ব্যয়িত হয়।

বিলাল, খাব্বাব, আম্মার, আম্মারের মা সুমাইয়্যা, সুহাইব, আবু ফুকাইহ প্রমুখ দাস-দাসী তাঁরই অর্থের বিনিময়ে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি লাভ করেন। তাই পরবর্তীকালে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেনঃ আমি প্রতিটি মানুষের ইহসান পরিশোধ করেছি।

কিন্তু আবু বকরের ইহসানসমূহ এমন যে, তা পরিশোধ করতে আমি অক্ষম।

তার প্রতিদান আল্লাহ দেবেন।

তার অর্থ আমার উপকারে যেমন এসেছে, অন্য কারো অর্থ তেমন আসেনি।

২য় অংশ

রাসূলুল্লাহর সা. মুখে মি’রাজের কথা শুনে অনেকেই যখন বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝখানে দোল খাচ্ছিল, তখন তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। হযরত হাসান রা. বলেনঃ ‘মি’রাজের কথা শুনে বহু সংখ্যক মুসলমান ইসলাম ত্যাগ করে।

লোকেরা আবু বকরের কাছে গিয়ে বলেঃ আবু বকর, তোমার বন্ধুকে তুমি বিশ্বাস কর?

সে বলেছে, সে নাকি গতরাতে বাইতুল মাকদাসে গিয়েছে, সেখানে সে নামায পড়েছে, অতঃপর মক্কায় ফিরে এসেছে।’

আবু বকর বললেনঃ তোমরা কি তাকে অবিশ্বাস কর? তারা বললঃ হ্যাঁ, ঐতো মসজিদে বসে লোকজনকে একথাই বলছে।

আবু বকর বললেনঃ আল্লাহর কসম, তিনি যদি এ কথা বলে থাকেন তাহলে সত্য কথাই বলেছেন। এতে অবাক হওয়ার কি দেখলে? তিনি তো আমাকে বলে থাকেন, তাঁর কাছে আল্লাহর কাছ থেকে ওহী আসে।

আকাশ থেকে ওহী আসে মাত্র এক মুহূর্তের মধ্যে। তাঁর সে কথাও আমি বিশ্বাস করি। তোমরা যে ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করছো এটা তার চেয়েও বিস্ময়কর। তারপর তিনি রাসূলুল্লাহর সা. কাছে গিয়ে হাজির হলেন।

তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর নবী, আপনি কি জনগণকে বলছেন যে, আপনি গতরাতে বাইতুল মাকদাস ভ্রমণ করেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আবু বকর বললেনঃ আপনি ঠিকই বলেছেন।

আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি নিঃসন্দেহে আল্লাহর রাসূল। রাসূলুল্লাহ সা. বললেনঃ হে আবু বকর, তুমি সিদ্দীক। এভাবে আবু বকর ‘সিদ্দীক’ উপাধিতে ভূষিত হন।

মক্কায় রাসূলুল্লাহর সা. অভ্যাস ছিল প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় আবু বকরের বাড়ীতে গমন করা।

কোন বিষয়ে পরামর্শের প্রয়োজন হলে তাঁর সাথে পরামর্শ করা।

রাসূল সা. দাওয়াত ও তাবলীগের উদ্দেশ্যে কোথাও গেলে তিনিও সাধারণতঃ সংগে থাকতেন।

মুসলমানদের ওপর মুশরিকদের অত্যাচার চরম আকার ধারণ করলে একবার তিনি হাবশায় হিজরাত করার ইচ্ছা করেছিলেন কিন্তু ‘ইবনুদ দাগনাহ’ নামক এক গোত্রপতি তাঁকে এ সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রাখে। সে কুরাইশদের হাত থেকে এ শর্তে নিরাপত্তা দেয় যে, আবু বকর প্রকাশ্যে সালাত আদায় করবেন না, কিন্তু দীর্ঘদিন এ শর্ত পালন করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তিনি ইবনুদ দাগনাহর নিরাপত্তা ফিরিয়ে দেন এবং অন্যান্য মুসলমান ভাইদের যে অবস্থা হয় সন্তুষ্টচিত্তে তা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়।

রাসূলুল্লাহর সা. হিজরাতের সেই কঠিন মুহূর্তে আবু বকরের কুরবানী, বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্য ও বন্ধুত্বের কথা ইতিহাসে চিরদিন অম্লান হয়ে থাকবে। তাঁর সাহচর্যের কথা তো পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষিত হয়েছে।

ইবন ইসহাক বলেন ‘‘আবু বকর রাসূলুল্লাহর সা. কাছে হিজরাতের অনুমতি চাইলে রাসূলুল্লাহ সা. তাঁকে বলতেনঃ তুমি তাড়াহুড়া করোনা। আল্লাহ হয়তো তোমাকে একজন সহযাত্রী জুটিয়ে দেবেন।

আবু বকর একথা শুনে ভাবতেন যে, রাসূলুল্লাহ সা. হয়তো নিজের কথাই বলছেন। তাই তিনি তখন থেকেই দুটো উট কিনে অত্যন্ত যত্ন সহকারে পুষতে থাকেন। এই আশায় যে, হিজরাতের সময় হয়তো কাজে লাগতে পারে।’’

উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা রা. বর্ণনা করেনঃ রাসূলুল্লাহ সা. দিনে অন্ততঃ একবার আবু বকরের বাড়ীতে আসতেন। যে দিন হিজরাতের অনুমতি পেলেন সেদিন দুপুরে আমাদের বাড়ীতে আসলেন, এমন সময় কখনো তিনি আসতেন না।

তাঁকে দেখা মাত্র আবু বকর বলে উঠলেন, নিশ্চয় কিছু একটা ঘটেছে। তা নাহলে এমন সময় রাসূলুল্লাহ সা. আসতেন না। তিনি বাড়ীতে প্রবেশ করলে আবু বকর তাঁর খাটের একধারে সরে বসলেন। আবু বকরের বাড়ীতে তখন আমি আর আমার বোন আসমা ছাড়া আর কেউ ছিল না।

রাসূলুল্লাহ সা. বললেনঃ তোমার এখানে অন্য যারা আছে তাদেরকে আমার কাছ থেকে সরিয়ে দাও। আবু বকর বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল, আমার দুই মেয়ে ছাড়া আর কেউ নেই। আপনার কি হয়েছে? রাসূলুল্লাহ সা. বললেনঃ আল্লাহ আমাকে হিজরাত করার অনুমতি দিয়েছেন।

আবু বকর জিজ্ঞেস করলেন, আমিও কি সংগে যেতে পারবো? রাসূলুল্লাহ সা. বললেনঃ হ্যাঁ, যেতে পারবে। আয়িশা বলেনঃ সে দিনের আগে আমি জানতাম না যে, মানুষ আনন্দের আতিশয্যে এত কাঁদতে পারে।

আমি আবু বকরকে রা. সেদিন কাঁদতে দেখেছি।

অতঃপর আবু বকর রা. বললেনঃ ‘হে আল্লাহর রাসূল! এই দেখুন, আমি এই উট দুটো এই কাজের জন্যই প্রস্তুত করে রেখেছি।’

তাঁরা আবদুল্লাহ ইবন উরায়কাতকে পথ দেখিয়ে নেয়ার জন্য ভাড়া করে সাথে নিলেন।

সে ছিল মুশরিক, তবে বিশ্বাসভাজন। রাতের আঁধারে তাঁরা আবু বকরের বাড়ীর পেছন দরজা দিয়ে বের হলেন এবং মক্কার নিম্নভূমিতে ‘সাওর’ পর্বতের একটি গুহায় আশ্রয় নিলেন।

হাসান বসরী রা. থেকে ইবন হিশাম বর্ণনা করেনঃ তাঁরা রাতে সাওর পর্বতের গুহায় পৌঁছেন। রাসূলুল্লাহর সা. প্রবেশের আগে আবু বকর রা. গুহায় প্রবেশ করলেন। সেখানে কোন হিংস্র প্রাণী বা সাপ-বিচ্ছু আছে কিনা তা দেখে নিলেন।

রাসূলুল্লাহকে সা. বিপদমুক্ত রাখার উদ্দেশ্যেই তিনি এরূপ ঝুঁকি নিয়েছিলেন।

মক্কায় উম্মুল মু’মিনীন হযরত খাদীজার ওফাতের পর রাসূলকে সা. যখন আবু বকর রা. বিমর্ষ দেখলেন, অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আদব সহকারে নিজের অল্পবয়স্কা কন্যা আয়িশাকে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে বিয়ে দেন। মোহরের অর্থও নিজেই পরিশোধ করেন।

হিজরাতের পর সকল অভিযানেই তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সাথে অংশগ্রহণ করেন।

কোন একটি অভিযানেও অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত হননি।

তাবুক অভিযানে তিনি ছিলেন মুসলিম

২য় অংশ

রাসূলুল্লাহর সা. মুখে মি’রাজের কথা শুনে অনেকেই যখন বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝখানে দোল খাচ্ছিল, তখন তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। হযরত হাসান রা. বলেনঃ ‘মি’রাজের কথা শুনে বহু সংখ্যক মুসলমান ইসলাম ত্যাগ করে।

লোকেরা আবু বকরের কাছে গিয়ে বলেঃ আবু বকর, তোমার বন্ধুকে তুমি বিশ্বাস কর?

সে বলেছে, সে নাকি গতরাতে বাইতুল মাকদাসে গিয়েছে, সেখানে সে নামায পড়েছে, অতঃপর মক্কায় ফিরে এসেছে।’

আবু বকর বললেনঃ তোমরা কি তাকে অবিশ্বাস কর? তারা বললঃ হ্যাঁ, ঐতো মসজিদে বসে লোকজনকে একথাই বলছে।

আবু বকর বললেনঃ আল্লাহর কসম, তিনি যদি এ কথা বলে থাকেন তাহলে সত্য কথাই বলেছেন। এতে অবাক হওয়ার কি দেখলে? তিনি তো আমাকে বলে থাকেন, তাঁর কাছে আল্লাহর কাছ থেকে ওহী আসে।

আকাশ থেকে ওহী আসে মাত্র এক মুহূর্তের মধ্যে। তাঁর সে কথাও আমি বিশ্বাস করি। তোমরা যে ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করছো এটা তার চেয়েও বিস্ময়কর। তারপর তিনি রাসূলুল্লাহর সা. কাছে গিয়ে হাজির হলেন।

তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর নবী, আপনি কি জনগণকে বলছেন যে, আপনি গতরাতে বাইতুল মাকদাস ভ্রমণ করেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আবু বকর বললেনঃ আপনি ঠিকই বলেছেন।

আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি নিঃসন্দেহে আল্লাহর রাসূল। রাসূলুল্লাহ সা. বললেনঃ হে আবু বকর, তুমি সিদ্দীক। এভাবে আবু বকর ‘সিদ্দীক’ উপাধিতে ভূষিত হন।

মক্কায় রাসূলুল্লাহর সা. অভ্যাস ছিল প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় আবু বকরের বাড়ীতে গমন করা।

কোন বিষয়ে পরামর্শের প্রয়োজন হলে তাঁর সাথে পরামর্শ করা।

রাসূল সা. দাওয়াত ও তাবলীগের উদ্দেশ্যে কোথাও গেলে তিনিও সাধারণতঃ সংগে থাকতেন।

মুসলমানদের ওপর মুশরিকদের অত্যাচার চরম আকার ধারণ করলে একবার তিনি হাবশায় হিজরাত করার ইচ্ছা করেছিলেন কিন্তু ‘ইবনুদ দাগনাহ’ নামক এক গোত্রপতি তাঁকে এ সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রাখে। সে কুরাইশদের হাত থেকে এ শর্তে নিরাপত্তা দেয় যে, আবু বকর প্রকাশ্যে সালাত আদায় করবেন না, কিন্তু দীর্ঘদিন এ শর্ত পালন করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তিনি ইবনুদ দাগনাহর নিরাপত্তা ফিরিয়ে দেন এবং অন্যান্য মুসলমান ভাইদের যে অবস্থা হয় সন্তুষ্টচিত্তে তা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়।

রাসূলুল্লাহর সা. হিজরাতের সেই কঠিন মুহূর্তে আবু বকরের কুরবানী, বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্য ও বন্ধুত্বের কথা ইতিহাসে চিরদিন অম্লান হয়ে থাকবে। তাঁর সাহচর্যের কথা তো পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষিত হয়েছে।

ইবন ইসহাক বলেন ‘‘আবু বকর রাসূলুল্লাহর সা. কাছে হিজরাতের অনুমতি চাইলে রাসূলুল্লাহ সা. তাঁকে বলতেনঃ তুমি তাড়াহুড়া করোনা। আল্লাহ হয়তো তোমাকে একজন সহযাত্রী জুটিয়ে দেবেন।

আবু বকর একথা শুনে ভাবতেন যে, রাসূলুল্লাহ সা. হয়তো নিজের কথাই বলছেন। তাই তিনি তখন থেকেই দুটো উট কিনে অত্যন্ত যত্ন সহকারে পুষতে থাকেন। এই আশায় যে, হিজরাতের সময় হয়তো কাজে লাগতে পারে।’’

উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা রা. বর্ণনা করেনঃ রাসূলুল্লাহ সা. দিনে অন্ততঃ একবার আবু বকরের বাড়ীতে আসতেন। যে দিন হিজরাতের অনুমতি পেলেন সেদিন দুপুরে আমাদের বাড়ীতে আসলেন, এমন সময় কখনো তিনি আসতেন না।

তাঁকে দেখা মাত্র আবু বকর বলে উঠলেন, নিশ্চয় কিছু একটা ঘটেছে। তা নাহলে এমন সময় রাসূলুল্লাহ সা. আসতেন না। তিনি বাড়ীতে প্রবেশ করলে আবু বকর তাঁর খাটের একধারে সরে বসলেন। আবু বকরের বাড়ীতে তখন আমি আর আমার বোন আসমা ছাড়া আর কেউ ছিল না।

রাসূলুল্লাহ সা. বললেনঃ তোমার এখানে অন্য যারা আছে তাদেরকে আমার কাছ থেকে সরিয়ে দাও। আবু বকর বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল, আমার দুই মেয়ে ছাড়া আর কেউ নেই। আপনার কি হয়েছে? রাসূলুল্লাহ সা. বললেনঃ আল্লাহ আমাকে হিজরাত করার অনুমতি দিয়েছেন।

আবু বকর জিজ্ঞেস করলেন, আমিও কি সংগে যেতে পারবো? রাসূলুল্লাহ সা. বললেনঃ হ্যাঁ, যেতে পারবে। আয়িশা বলেনঃ সে দিনের আগে আমি জানতাম না যে, মানুষ আনন্দের আতিশয্যে এত কাঁদতে পারে।

আমি আবু বকরকে রা. সেদিন কাঁদতে দেখেছি।

অতঃপর আবু বকর রা. বললেনঃ ‘হে আল্লাহর রাসূল! এই দেখুন, আমি এই উট দুটো এই কাজের জন্যই প্রস্তুত করে রেখেছি।’

তাঁরা আবদুল্লাহ ইবন উরায়কাতকে পথ দেখিয়ে নেয়ার জন্য ভাড়া করে সাথে নিলেন।

সে ছিল মুশরিক, তবে বিশ্বাসভাজন। রাতের আঁধারে তাঁরা আবু বকরের বাড়ীর পেছন দরজা দিয়ে বের হলেন এবং মক্কার নিম্নভূমিতে ‘সাওর’ পর্বতের একটি গুহায় আশ্রয় নিলেন।

হাসান বসরী রা. থেকে ইবন হিশাম বর্ণনা করেনঃ তাঁরা রাতে সাওর পর্বতের গুহায় পৌঁছেন। রাসূলুল্লাহর সা. প্রবেশের আগে আবু বকর রা. গুহায় প্রবেশ করলেন। সেখানে কোন হিংস্র প্রাণী বা সাপ-বিচ্ছু আছে কিনা তা দেখে নিলেন।

রাসূলুল্লাহকে সা. বিপদমুক্ত রাখার উদ্দেশ্যেই তিনি এরূপ ঝুঁকি নিয়েছিলেন।

মক্কায় উম্মুল মু’মিনীন হযরত খাদীজার ওফাতের পর রাসূলকে সা. যখন আবু বকর রা. বিমর্ষ দেখলেন, অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আদব সহকারে নিজের অল্পবয়স্কা কন্যা আয়িশাকে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে বিয়ে দেন। মোহরের অর্থও নিজেই পরিশোধ করেন।

হিজরাতের পর সকল অভিযানেই তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সাথে অংশগ্রহণ করেন।

কোন একটি অভিযানেও অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত হননি।

তাবুক অভিযানে তিনি ছিলেন মুসলিম বাহিনীর পতাকাবাহী।

এ অভিযানের সময় রাসূলুল্লাহর সা. আবেদনে সাড়া দিয়ে বাড়ীতে যা কিছু অর্থ-সম্পদ ছিল সবই তিনি রাসূলুল্লাহর সা. হাতে তুলে দেন। আল্লাহর রাসূল সা. জিজ্ঞেস করেন, ‘ছেলে-মেয়েদের জন্য বাড়ীতে কিছু রেখেছো কি?’ জবাব দিলেন, ‘তাদের জন্য আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলই যথেষ্ট।’

মক্কা বিজয়ের পর নবম হিজরীতে প্রথম ইসলামী হজ্জ আদায় উপলক্ষে রাসূলুল্লাহ সা. আবু বকরকে রা. ‘আমীরুল হজ্ব’ নিয়োগ করেন। রাসূলুল্লাহর সা. অন্তিম রোগ শয্যায় তাঁরই নির্দেশে মসজিদে নববীর নামাযের ইমামতির দায়িত্ব পালন করেন।

মোটকথা, রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় আবু বকর রা. তাঁর উযীর ও উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করেন।

৩য় অংশ

রাসূলূল্লাহর সা. ওফাতের পর আবু বকর রা. তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন।

‘খলীফাতু রাসূলিল্লাহ’- এ লকবটি কেবল তাঁকেই দেওয়া হয়। পরবর্তী খলীফাদের ‘আমীরুল মু’মিনীন’ উপাধি দেওয়া হয়েছে।

ব্যবসায় ছিল তাঁর পেশা। ইসলাম-পূর্ব যুগে কুরাইশদের এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ছিলেন।

ইসলাম গ্রহণের পরেও জীবিকার প্রয়োজনে এ পেশা চালিয়ে যেতে থাকেন। তবে খলিফা হওয়ার পর খিলাফতের গুরু দায়িত্ব কাঁধে পড়ায় ব্যবসার পাট চুকাতে বাধ্য হন। হযরত ’উমার ও আবু উবাইদার পীড়াপীড়িতে মজলিসে শূরার সিদ্ধান্ত মুতাবিক প্রয়োজন অনুপাতে ‘বাইতুল মাল’ থেকে ন্যূনতম ভাতা গ্রহণ করতে স্বীকৃত হন।

যার পরিমাণ ছিল বাৎসরিক আড়াই হাজার দিরহাম। তবে মৃত্যুর পূর্বে তাঁর স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে ‘বাইতুলমাল’ থেকে গৃহীত সমুদয় অর্থ ফেরতদানের নির্দেশ দিয়ে যান।

রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতের সংবাদে সাহাবামণ্ডলী যখন সম্পূর্ণ হতভম্ব, তাঁরা যখন চিন্তাই করতে পারছিলেন না, রাসূলের সা. ওফাত হতে পারে, এমনকি হযরত ’উমার রা. কোষমুক্ত তরবারি হাতে নিয়ে ঘোষণা করে বসেন- ‘যে বলবে রাসূলের সা. ওফাত হয়েছে তাঁকে হত্যা করবো।’ এমনই এক ভাব-বিহ্বল পরিবেশেও আবু বকর রা. ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ় ও অবিচল।

সমবেত জনতাকে লক্ষ্য করে তিনি ঘোষণা করেনঃ ‘যারা মুহাম্মাদের ইবাদাত করতে তারা জেনে রাখ, মুহাম্মাদ মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু যারা আল্লাহর ইবাদত কর তারা জেনে রাখ আল্লাহ চিরঞ্জীব- তাঁর মৃত্যু নেই।’ তারপর এ আয়াত পাঠ করেনঃ ‘মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল ছাড়া আর কিছু নন। তাঁর পূর্বে বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছে।

তিনি যদি মারা যান বা নিহত হন তাহলে তোমরা কি পেছনে ফিরে যাবে? যারা পেছনে ফিরে যাবে তারা আল্লাহর কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। যারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শিগগিরই আল্লাহ তাদের প্রতিদান দেবেন।’ (সূরা আলে ইমরান–১৪৪)

আবু বকরের মুখে এ আয়াত শুনার সাথে সাথে লোকেরা যেন সম্বিত ফিরে পেল। তাদের কাছে মনে হল এ আয়াত যেন তারা এই প্রথম শুনছে। এভাবে রাসূলুল্লাহর সা. ইনতিকালের সাথে সাথে প্রথম যে মারাত্মক সমস্যাটি দেখা দেয়, আবু বকরের রা. দৃঢ় হস্তক্ষেপে তার পরিসমাপ্তি ঘটে।

রাসূলুল্লাহর সা. কাফন-দাফন তখনো সম্পন্ন হতে পারেনি। এরই মধ্যে তাঁর স্থলাভিষিক্তির বিষয়টি জটিল আকার ধারণ করলো। মদীনার জনগণ, বিশেষত আনসাররা ‘সাকীফা বনী সায়েদা’ নামক স্থানে সমবেত হলো। আনসাররা দাবী করলো, যেহেতু আমরা রাসূলুল্লাহকে সা. আশ্রয় দিয়েছি, নিজেদের জান-মালের বিনিময়ে দুর্বল ইসলামকে সবল ও শক্তিশালী করেছি, আমাদের মধ্য থেকে কাউকে রাসূলুল্লাহর সা. স্থলাভিষিক্ত করতে হবে। মুহাজিরদের কাছে এ দাবী গ্রহণযোগ্য হলো না। তারা বললোঃ ইসলামের বীজ আমরা বপন করেছি এবং আমরাই তাতে পানি সিঞ্চন করেছি। সুতরাং আমরাই খিলাফতের অধিকতর হকদার। পরিস্থিতি ভিন্নদিকে মোড় নিল। আবু বকরকে রা. ডাকা হল। তিনি তখন রাসূলুল্লাহর সা. পবিত্র মরদেহের নিকট। তিনি উপস্থিত হয়ে ধীর-স্থিরভাবে কথা বললেন। তাঁর যুক্তি ও প্রমাণের কাছে আনসাররা নতি স্বীকার করলো। এভাবে রাসূলুল্লাহর সা. ইনতিকালের পর দ্বিতীয় যে সমস্যাটি দেখা দেয়, আবু বকরের রা. বুদ্ধি ও বিচক্ষণতায় তারও সুন্দর সমাধান হয়ে যায়।

আবু বকর খলীফা নির্বাচিত হলেন। খলীফা হওয়ার পর সমবেত মুহাজির ও আনসারদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে বলেনঃ ‘আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই আমাকে খলীফা বানানো হয়েছে। আল্লাহর কসম, আমি চাচ্ছিলাম, আপনাদের মধ্য থেকে অন্য কেউ এ দায়িত্ব গ্রহণ করুক। আমি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আপনারা যদি চান আমার আচরণ রাসূলুল্লাহর সা. আচরণের মত হোক, তাহলে আমাকে সেই পর্যায়ে পৌঁছার ব্যাপারে অক্ষম মনে করবেন। তিনি ছিলেন নবী। ভুলত্রুটি থেকে ছিলেন পবিত্র। তাঁর মত আমার কোন বিশেষ মর্যাদা নেই।

আমি একজন সাধারণ মানুষ। আপনাদের কোন একজন সাধারণ ব্যক্তি থেকেও উত্তম হওয়ার দাবী আমি করতে পারিনে।

আপনারা যদি দেখেন আমি সঠিক কাজ করছি, আমার সহায়তা করবেন। যদি দেখেন আমি বিপথগামী হচ্ছি, আমাকে সতর্ক করে দেবেন। তাঁর সেই নীতিনির্ধারণী সংক্ষিপ্ত প্রথম ভাষণটি চিরকাল বিশ্বের সকল রাষ্ট্রনায়কদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।

তাঁর চরিত্রের সীমাহীন দৃঢ়তার আর এক প্রকাশ ঘটে রাসূলুল্লাহর সা. ইনতিকালের অব্যবহিত পরে উসামা ইবন যায়িদের বাহিনীকে পাঠানোর মাধ্যমে। রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতের অল্প কিছুদিন আগে মুতা অভিযানে শাহাদাত প্রাপ্ত যায়িদ ইবন হারিসা, জাফর ইবন আবী তালিব ও আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার রা. রক্তের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য একটি বাহিনী প্রস্তুত করেন। এ বাহিনীর কমাণ্ডার নিযুক্ত করেন নওজোয়ান উসামা ইবন যায়িদকে। রাসূলুল্লাহর সা. নির্দেশে উসামা তাঁর বাহিনীসহ সিরিয়ার দিকে রওয়ানা হলেন।

তাঁরা মদীনা থেকে বের হতেই রাসূলুল্লাহ সা. অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁরা মদীনার উপকণ্ঠে শিবির স্থাপন করে রাসূলুল্লাহ সা. অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁরা মদীনার উপকণ্ঠে শিবির স্থাপন করে রাসূলুল্লাহর সা. রোগমুক্তির প্রতীক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু এ রোগেই রাসূল সা. ইনতিকাল করেন। আবু বকর রা. খলীফা হলেন। এদিকে রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতের সংবাদের আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন দিকে নানা অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে। কেউবা ইসলাম ত্যাগ করে, কেউবা যাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানায়, আবার কেউবা নবুওয়াত দাবী করে বনে।

এমনি এক চরম অবস্থায় অনেকে পরামর্শ দিলেন উসামার বাহিনী পাঠানোর ব্যাপারটি স্থগিত রাখতে। কিন্তু আবু বকর রা. অত্যন্ত কঠোরভাবে এ পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনি যদি এ বাহিনী পাঠাতে ইতস্ততঃ করতেন বা বিলম্ব করতেন তাহলে খিলাফতের দায়িত্ব লাভের পর এটা হতো রাসূলুল্লাহর সা. নির্দেশের প্রথম বিরুদ্ধাচরণ। কারণ, অন্তিম রোগশয্যায় তিনি উসামার বাহিনীকে যাত্রার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

আবু বকর রা. উসামার বাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন। তখন আনসারদের একটি দল দাবী করলেন, তাহলে অন্ততঃ উসামাকে কমাণ্ডরের পদ থেকে সরিয়ে অন্য কোন বয়স্ক সাহাবীকে তাঁর স্থলে নিয়োগ করা হোক। উল্লেখ্য যে, তখন উসামার বয়স মাত্র বিশ বছর।

আবু বকর (রা:)-এর মর্যাদা

আবূদ্দারদা (রা:) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (সাঃ)-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। এমন সময় আবূ বকর (রা:) পরনের কাপড়ের একপাশ এমনভাবে ধরে আসলেন যে, তার দুহাঁটু বেরিয়ে পড়ছিল।

নবী (সাঃ) বললেন, তোমাদের এ সাথী এই মাত্র কারো সঙ্গে ঝগড়া করে আসছে। তিনি সালাম করলেন এবং বললেন, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আমার এবং ওমর ইবনুল খাত্তাবের মাঝে একটি বিষয়ে কিছু কথা কাটাকাটি হয়ে গেছে।

আমিই প্রথমে কটু কথা বলেছি।অতঃপর লজ্জিত হয়ে তার কাছে মাফ চেয়েছি। কিন্তু তিনি আমাকে মাফ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।এখন আমি আপনার নিকট হাযির হয়েছি।

নবী (সাঃ) বললেন, আল্লাহ্‌ তোমাকে মাফ করবেন, হে আবূ বকর! এ কথাটি তিনি তিনবার বললেন। অতঃপর ওমর (রা:) লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে আবূ বকর (রা:)-এর বাড়িতে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আবূ বকর কি বাড়িতে আছেন? তারা বলল, না। তখন ওমর (রা:) নবী (সাঃ)-এর নিকট চলে এসে সালাম দিলেন। (তাকে দেখে) নবী (সাঃ)-এর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল।

আবূ বকর (রা:) ভীত হয়ে নতজানু হয়ে বললেন, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আমিই প্রথমে অন্যায় করেছি। এ কথাটি তিনি দুবার বললেন। তখন নবী (সাঃ) বললেন, আল্লাহ্‌ যখন আমাকে তোমাদের নিকট রাসূলরূপে প্রেরণ করেছেন তখন তোমরা সবাই বলেছ, তুমি মিথ্যা বলছ আর আবূ বকর বলেছে, আপনি সত্য বলেছেন।

তাঁর জান-মাল সবকিছু দিয়ে আমাকে সহানুভূতি জানিয়েছে।তোমরা কি আমার সম্মানে আমার সাথীকে অব্যাহতি দিবে? এ কথাটি তিনি দুবার বললেন। অতঃপর আবূ বকর (রা:)-কে আর কখনও কষ্ট দেয়া হয়নি (বুখারী হা/৩৬৬১ ‘রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর ছাহাবীদের ফযীলত’অধ্যায়, অনুচেছদ-৫)।

শিক্ষা:

১. ক্ষমা মহত্ত্বের লক্ষণ।

২. রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর প্রতি আবূবকর (রা:)-এর ভালবাসা ও সাহায্য- সহানুভূতি ছিল প্রবাদ তুল্য। এজন্যই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছিলেন, ‘আমি যদি আমার রব ব্যতীত অন্য কাউকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করতাম তাহলে আবূবকরকে গ্রহণ করতাম’ (বুখারী হা/৩৬৫৭, ‘ছাহাবীদের ফযীলত’অধ্যায়, অনুচেছদ-৫) ।

—–#—–

সংগ্রহীতঃহায়াতুস্ সাহাবা

তুচ্ছ নয় রক্তদান বাঁচাতে পারে একটি প্রান