আসিফ ইকবালের লেখা গল্পঃ সততায় সফলতা

 

লেখক:মোঃ আসিফ ইকবাল

অনেক দিন আগে আব্দুর রহমান নামের একজন যুবক ব্যাবসায়ী ছিলেন । তিনি চারিদিকে একজন ভাল মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন । তার সকল কর্মচারীদের কাছে ও ছিলেন অত্যন্ত প্রিয় । তিনি খুব ই সততার সাথে ব্যাবসা পরিচালনা করতেন ,ফলে অল্প দিনে ই তার ব্যাবসার সুনাম সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল দেশে বিদেশে । অল্পদিনে ই অনেক অর্থ সম্পদের মালিক হয়ে গেলে গেলেন কিন্তু তার মনে বিন্দু পরিমান ও অহংকার ছিল না, অত্যন্ত সাদাসিদে জীবন জাপন করতেন ।

তার কর্মচারিদের মধ্যে তিন ভাই ছিল যারা তার ছাগলের পাল দেখাশুনা করত । এদের মধ্যে ছোট ভাইটি ছিল তার কাছে অন্তত্য প্রিয় । যার নাম ছিল তারিক , অন্য দুই ভাই জায়েদ ও রাশেদ । ছোট ভাইটি ছিল অন্তত্য নিষ্ঠাবান কর্মচারি , আমানতদার , এবং আল্লাহ ভিরু । আব্দুর রহমান ছোট ভাই টিকে ভালবাসতেন বলে অন্য দুই ভাই তারিককে হিংসা করত । মনিবের চোখে তাকে হেয় করার চেষ্টা করত । কিন্তু তারিক তার ভাইদের প্রতি রাগ না করে আল্লাহর কাছের তাদের সংশোধনের জন্য দোয়া করত ।

এর ই মাঝে চারিদিকে খবর ছড়িয়ে পরলো খলিফা তার বিবাহ যোগ্য মেয়েকে বিয়ে দিবেন আর পাত্র হিসেবে একজন দ্বীনদ্বার , সৎ , যোগ্যতা সম্পন্ন পাত্রি খুজছেন । অনেকে ই নাকি খলিফার কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেছেন কিন্তু খলিফার কাছে নিজেকে দ্বীনদ্বার , সৎ , যোগ্য হিসেবে প্রমান করতে পারেন নি ।

একদিন সকালে আব্দুর রহমানের পিতৃতুল্য প্রতিবেশি মুহতারাম ওমর শেখ আসলেন আব্দুর রহমানের বাড়িতে । আব্দুর রহমান তাকে সম্মানের সহিত বসতে দিলেন এবং আতিথীয়তার ব্যাবস্থা করলেন । ওমর শেখ আব্দুর রহমান কে বললেন “ শোন বাছা ! তোমার বাবা আমার অত্যন্ত প্রিয় বন্ধু ছিলেন , অকালেই চলে গেলেন আল্লাহর কাছে , তোমার বাবার ইচ্ছে ছিল তোমাকে বনেদি ঘরের মেয়ের সাথে বিয়ে করারবেন ,আর মৃত্যুর কিছুদিন আমাকে অসিয়ত করেছিলেন তিনি যদি মারা যান তবে আমি যেন তোমার জন্য তেমন একটা মেয়ে খুজে দি, এতদিন তুমি তোমার ব্যাবসা নিয়ে ব্যাস্ত ছিলে তাই বলি নি , এখন তো তোমার সুনাম দেশ বিদেশ ব্যাপি , আর সকলের কাছে তুমি একজন ভাল মানুষ হিসেবে পরিচিত । আমি শুনেছি খলিফা তার মেয়ের জন্য যোগ্য পাত্র সন্ধান করছেন , আমার মনে হয় এই খিলাফতে তোমার চেয়ে যোগ্য পাত্র আর দ্বিতীয়টি নেই । তাই আমি তোমাকে খলিফার কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাওয়ার জন্য বলছি ,’’

ওমর শেখের কথায় আব্দুর রহমান সম্মত হলেন খলিফার কাছে যাওয়ার জন্য । আব্দুর রহমান তাই তার প্রিয় কর্মচারি তারিককে ডাকলেন । এবং ব্যাবসার কিছু কাজ বুঝিয়ে দিয়ে বললেন আমি জরুরী কাজের জন্য কয়েকদিন ব্যাবসার দিকে নজর দিতে পারব না । এই এই বিষয় গুলো তোমাকে দেখতে হবে । আমি তোমাকে ভরসা করি তাই তোমাকে ই এই দেখাশুনার দ্বায়িত্ব দিলাম । আশাকরি তুমি যথাযথ ভাবে আমানত রক্ষা করবে ।

তারিক খুশি মনে মনিবের দেয়া দ্বায়িত্ব নিয়ে কাজে মন দিল। আর অন্য দুই ভাইকে তাদের কাজ বুঝিয়ে দিল। কিন্তু তার বড় দুই ভাই তার উপর মোটেও খুশি হল না , মনিবের অবর্তমানে মনিবের দায়িত্ব তাদের ছোট ভাই পালন করবে এটা তারা মেনে নিতে পারল না ।

এদিকে আব্দুর রহমান খলিফার দরবারে গিয়ে হাজির হলেন । খলিফা তাকে চিনতে পারলেন এবং তার আতিথীয়তার ব্যাবস্থা করলেন । এরপর খলিফা তার আগমনের কারন জানতে চাইলেন । খলিফাকে আব্দুর রহমান জানালেন তার চাচা শুনেছেন যে খলিফা তার মেয়ের বিয়ের জন্য পাত্র খুজছেন ,এবং চাচার মতে আব্দুর রহমান ই খলিফার মেয়ের জন্য উপযুক্ত পাত্র । তাই চাচার আদেশে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন।

খলিফা আব্দুর রহমানের কথা শুনে বললেন , আমি তোমাকে চিনি , ব্যাবসায়ি হিসেবে তোমার যেমন ক্ষাতি আছে অর্থসম্পদ ও আল্লাহর ইচ্ছায় অনেক আছে , কিন্তু আমি আমার মেয়ের জন্য সৎ এবং আল্লাহ ভীরু পাত্র খুজছি । তুমি কি আমাকে নিজের সৎ হওয়ার ব্যাপারে কি প্রমান দিতে পারবে? আমার সামনে আল্লাহর নামে শপথ করে নিজের আমানত দারিতার ব্যাপারে বলতে পারবে ?

আব্দুর রহমান ছিল সত্যি ই আল্লাহ ভিরু একজন মানুষ । তাই তিনি চিন্তা করলেন যে তার কাছ থেকে নিজের অজান্তে ও আমানতের খেয়ানত হতে পারে , তাহলে আল্লাহর নামে শপথ করে নিজের আমানত দারিতার ব্যাপারে কিভাবে বলবে ?

তাই তিনি খলিফার কাছে এই ব্যাপারে অপারগতা প্রকাশ করে ফিরে আসলেন ।

কিন্তু নিজের বাড়িতে ফিরে এসে জানতে পারলেন তার অনুপস্থিতিতে খামার থেকে ১০ টি ছাগল হারিয়ে গেছে বা চুরি হয়ে গেছে । এতে তিনি খুব ই মর্মাহত হলেন । তিনি তারিককে ডেকে পাঠালেন । তারিক এসে তাকে জানাল যে সে সারাক্ষন ই ছাগল গুলোর আশেপাশে ই ছিল কিন্তু কিভাবে ছাগল নিখোজ হয়েছে সে ব্যাপারে তারিক কিছুই বলতে পারবে না।

তারিককে শুধু নিজের কাজের ব্যাপারে আরো যত্নশীল হতে বলে বিদায় দিলেন আব্দুর রহমান , কিন্তু খানিক বাদে অন্য দুই ভাই আব্দুর রহমানের কাছে এসে তারিকের দ্বায়িত্বহীনতার ব্যাপারে বিভিন্ন কথা বলতে লাগলেন । আব্দুর রহমান দুই ভাইয়ের কথা শুনে তারিকের উপর খানিক রেগে গেলন ,এবং আবার ডেকে আনলেন আর বললেন যে ১০ টা ছাগলের দাম মিটাতে হবে অন্যথায় তারিককে ২ মাস বিনা বেতনে কাজ করতে হবে , তারিক মনিবের এই রকম বিচারে অনেক কষ্ট পেলে ও মুখ ফুটে কিছু বল্লো না , শুধু বললো যে সে দুই মাস বিনা বেতনে কাজ করবে কারণ ১০ টা ছাগলের দাম পরিশোধ করার সামর্থ তার নেই ।

তারিককে শাস্তি দেয়ায় অন্য দুই ভাই মনে মনে অনেক খুশি হল । তারিক শাস্তি মেনে নিয়ে আবার পূর্ন দায়ত্বশীলতার সাথে কাজ করতে লাগল।

কিছু দিন পর আব্দুর রহমান আবার ব্যাক্তিগত কাজে বাইরে গেলেন । এবার বড় ভাইকে দ্বায়িত্ব দিয়ে গেল খামার দেখা শোনার । বড় ভাই অন্য দুই ভাইকে যার যার কাজ বুঝিয়ে দিল, কিন্তু দেখা গেল বেশি ভাগ কাজ তারিককেই দেয়া হল। তবু ও তারিক কোন আপত্তি করলো না ।

দুই দিন পরে আব্দুর রহমান ফিরে আসলেন । এসে দেখলেন এবার ও প্রায় ২০ টি ছাগল খামার থেকে ও গায়েব হয়ে গেছে । আব্দুর রহমান বড় ভাইকে ডেকে পাঠালেন । বড় ভাই এসে বললো খামারের যে অংশ থেকে ছাগল হারিয়েছে সেই অংশের দ্বায়িত্বে তারিক ছিল । এক আগন্তুক এসেছিলেন ছাগল কিনতে , আপনি না থাকার খবর পেয়ে তিনি আমাকে এবং রাশেদ কে প্রস্তাব দিয়েছিল তার সাথে অনৈতিক লেনদেন করতে কিন্তু আমরা রাজি হই নি । হতে পারে তারিক তার সাথে অনৈতিক লেনদেন করেছে । বড় ভাইয়ের কথা শুনে আব্দুর রহমান অত্যন্ত মর্মাহত হলেন কারন তিনি তারিককে সবসময় আমানতদার হিসেবে দেখেছেন । আব্দুর রহমানের বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল যে তারিককে তার খামার থেকে ছাগল চুরি করে অন্যত্র বিক্রি করেছে , তাই সে বড় ভাইর কাছে প্রমান চাইল । কিন্তু বড় ভাই বললো যে তারিকের অনৈতিক লেনদেনের প্রমান তার হাতে নেই ,কিন্তু কেউ কোন অপরাধ করলে তার কিছু না কিছু প্রমান থেকে ই যায় হয়ত খুজলে পাওয়া যাবে । আব্দুর রহমান বড় ভাইকে প্রমান জোগার করতে বললেন এবং আরো জানালেন প্রমান পাওয়া গেলে তারিককে খলিফার কাছে নিয়ে যাওয়া হবে এবং খলিফা ই তারকের বিচার করবেন ।

বড় ভাই আব্দুর রহমানের কথা পুলতিক হল । এবং রাশেদকে জোড়ালো প্রমান দাড়া করাতে বল্লো ।

দুই ভাই বাড়ি গিয়ে তাদের মায়ের হাতে কিছু টাকা দিয়ে বললো আজকে আমরা সারাদিন অনেক কাজ করেছি তাই ক্লান্ত ,তুমি যদি তারিককে বাজারে পাটাও তাহলে সে আজকে বাজার করে নিয়ে আসতে পারবে । মা সরল মনে তারিককে বাজারে পাঠাল , তারিক ও বাজারে গেল সরল মনে ।

আর এদিকে দুই ভাই আব্দুর রহমানের কাছে গিয়ে বললো , আপনি গত দুই মাস ধরে তারিককে বেতন দিচ্ছেন না কিন্তু সে আজকে বাজারে গেছে সাথে দুই টা বড় বড় ব্যাগ নিয়ে , আপনি যদি আমাদের কথা বিশ্বাস না করেন তবে বাজার থেকে ফেরার পথে দাঁড়িয়ে থাকলে সত্যটা দেখতে পারবেন ।

আব্দুর রহমান বাজার থেকে ফেরার পথে ছদ্মবেশে দাড়িয়ে থাকল , কিছুক্ষন বাদে ই তারিক ব্যাগ ভরতি বাজার নিয়ে আসতে লাগলো । এই দৃশ্য দেখে আব্দুর রহমান অত্যন্ত মর্মাহত হলেন এবং সাথে অত্যন্ত রাগান্বিত ও হলেন । এবং ঠিক করলেন পরদিন সকালে ই তারিককে নিয়ে খলিফার কাছে যাবেন বিচারের জন্য ।

পর দিন সকালে তিন ভাই কাজে আসলো , আব্দুর রহমান তিন ভাইকে ডাকলো , তারা আসলো । আব্দুর রহমান তারিককে ডেকে বললো আমার খামার থেকে যে ছাগল হারিয়ে গেছে তা যে তুমি চুরি করেছ সে ব্যাপারে আমার কাছে তথ্য প্রমান রয়েছে , আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম কিন্তু তুমি বিশ্বাসের মর্যাদা দিলে না।

কিন্তু তারিক এবার প্রতিবাদ জানাল , কিন্তু তারিকের ভাইরা ও তারিককের বিরুদ্ধে সাক্ষি দিল। এতে তাদের চার জনের মধ্যে খানিকটা তর্ক লেগে গেল।

এমন সময় হটাৎ তাদের মাঝে খলিফা লোকজন সহ হাজির হলেন , সবাই আশ্চর্য , এখানে খলিফা আসলেন কেন?

খলিফা আব্দুর রহমানকে উদ্দেশ্য করে বললেন আমি তোমার কাছে এসেছি তোমার এই কর্মচারির ব্যাপারে কথা বলতে , তারিককে উদ্দেশ্য করে খলিফা বললেন আমি আমার খেলাফতের মধ্যে এই একজনকে খুজে পেয়েছি সৎ , দায়িত্বশীল এবং আমানতদারি হিসেবে।

কিন্তু আব্দুর রহমান খলিফার কথার প্রতিবাদ করে বললেন , কিন্তু আমি ত তারিককে চোর হিসেবে ধরেছি । সে আমার ছাগলের খামার থেকে ছাগল চুরি করে অন্যত্র বিক্রি করেছেন।

কিন্তু খলিফা বললেন “ আব্দুর রহমান তুমি আসলে সব কাহীনি জানো না , আমি আমার খেলাফত পরিদর্শনের জন্য কিছু দিন আগে ছদ্মবেশে বেড়িয়েছিলাম , তোমার খামারের কাছে এসে জানতে পারলাম যে তুমি ব্যাক্তিগত কাজে বাইরে গেছ , তাই আমি তোমার কর্মচারিদের আমানতদারিতা পরিক্ষা করার জন্য খামারের ভিতর গেলাম , তারিককে আমি বললাম যে তুমি আমার কাছ থেকে কিছু বিনময় গ্রহন করো এবং খামার থেকে কিছু ছাগল দেও , মালিক ফিরে এলে বলবে যে ছাগল বাঘের খেয়ে গেছে । কিন্তু তারিককে আমাকে বল্লো যে হে আগন্তুক আমি আল্লাহকে ভয় করি , আপনি ও আল্লাহকে ভয় করুন । এরপর আমি আবার অন্য দুই ভাইইয়ের কাছে গেলাম তখন তারা আমার প্রস্তাবে রাজি হল,। তখন তাদের থেকে ছাগল নিয়ে গেলাম , কিন্তু আমি আশা করেছিলাম তারা দুই ভাই অনুতপ্ত হবে কিন্তু তাদের অনুতপ্ত হওয়ার কোন খবর না পেয়ে আমি এখানে এসেছি । আমি এখন এই দুই ভাইকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাব এবং কাজির কাছে সব তথ্য প্রমান উপস্থাপন করব , তিনি আল্লাহর দেয়া আইন মত এদের বিচার করবেন ।

খলিফার কাছ সব কথা শুনে আব্দুর রহমানের ভুল ভাঙলো, তিনি তার বিশ্বস্ত কর্মচারি তারিককে বুকে জড়িয়ে নিলেন ।

খলিফা তারিকের সততার পুরষ্কার হিসেবে খলিফার মেয়েকে তারিকের সাথে বিয়ে দেয়ার ঘোষনা দিলেন আর সাথে সাথে তারিককে খেলাফতের কোষাগারের রক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করলেন ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares