মানবতার পাগল করোনা-কালীন সেচ্ছাসেবী অঙ্গনের সুপারহিরো এক কওমি মাদ্রাসার আলেম।

 

স্টাফ রিপোর্টার: আব্দুস সামাদ।

করোনা ভাইরাসের কারণে যখন পুরো পৃথিবীটা একেবারেই অসহায় হয়ে পড়েছে। যার থাবা থেকে বাদ যায়নি আমাদের বাংলাদেশটাও। আমাদের বাংলাদেশেও প্রতিদিনই অসংখ্য রোগী করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন এবং প্রতিদিন অনেক মানুষ করোনা রুগে মারাও যাচ্ছেন। দেশের এই দুঃসময়ে করোনায় আক্রান্ত-রোগীরা যখন সামাজিক ও পারিবারিকভাবে নানা ধরনের লাঞ্চনার স্বীকার হচ্ছেন প্রতিনিয়তই।

যখন সন্তান তার করোনা আক্রান্ত বাবা-মা’র মরদেহ গ্রহণে অস্বীকৃতি প্রকাশ করতেছে, বাবা-মা’র লাশটা ফেলে যাচ্ছে ঝোপঝাড়ে।

দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে বসে থাকেননি কওমি সন্তানরাও। তারা তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনা রোগীদের সেবায় নিজেদের সপে দিয়েছেন,মাঠে নেমে কাজ করে যাচ্ছেন রবের সন্তুষ্টির জন্য।

তাদেরই অন্যতম একজন মানবতার ফেরিওয়ালা, নিবেদিত প্রাণ সেচ্ছাসেবী মাওলানা জুনায়েদ আহসান (জুনু)।

তিনি করোনা রোগীদের সেবা দিচ্ছেন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। মানুষের সেবার জন্য তিনি নিজেই প্রতিষ্ঠা করেছেন “বিডি আর্তসেবা ফাউন্ডেশন” নামে একটি মানবিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।

আরবিপি নিউজের স্টাফ রিপোর্টারের সঙ্গে আলাপ-চারীতায় ফুটে উঠে তার ব্যক্তিগত দিক ও বর্তমাম কাজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা।

আব্দুস সামাদ: আসসালামু আলাইকুম।
কেমন আছেন?

জুনায়েদ: ওয়ালাইকুম উস সালাম, আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহর রহমতে অনেক ভালো আছি।

আব্দুস সামাদ: আপনার পরিচয় জানতে চাচ্ছিলাম?

জুনায়েদ: আমার ডাক নাম জুনু, রাজধানীর মিরপুর ১৪ নম্বরে কচুক্ষেত বাজারের উল্টো পাশে বসবাস করি। বাবা ডাক্তার মোহাম্মদ হাকিম শাহাব উদ্দিন এবং মা মোছাম্মৎ সালমা বেগম। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে আমি সবার ছোট।

আব্দুস সামাদ: লিখাপড়া নিয়ে কিছু জানতে চাচ্ছিলাম।

জুনায়েদ: আমি জামেয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া মাদ্রাসা থেকে ২০১৮ সালে ফারেগ হই, এবং বর্তমানে ইউনানি কলেজে ডিপ্লোমা করতেছি।

আব্দুস সামাদ: আপনি কুর্মিটোলা হাসপাতালে কিভাবে আসলেন?

জুনায়েদ: জ্বী আমাদের একজন সেচ্ছাসেবী বন্ধু শেখ ঈশান করোনা আক্রান্ত হয়ে যখন কুর্মিটোলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তখন তার কাছে আমি প্রায়ই আসতাম। আমি তার কাছে একদিন জানতে চাইলাম আচ্ছা আমরা প্রায়ই শুনি হাসপাতালে রোগীদের জন্য অক্সিজেন নেই, তারা চিকিৎসা ঠিকমত পায় না, সঠিক বাস্তবতা কী? তখন সে আমাকে বললো, অক্সিজেন অনেক আছে। কিন্তু সেগুলো গেটের সামনে রাখা থাকে। রুগীর অক্সিজেনের দরকার হলে নিজেরটা নিজেই এনে ব্যবহার করতে হয়। বয়স্ক ও বেশি অসুস্থ রুগীদের নিজের অক্সিজেন নিজে নিয়ে এসে লাগানো সম্ভব না। আমি তাকে আরো জিজ্ঞেস করি আর কী কী সমস্যা? তখন সে বলে যেখানে তার নিজের পরিবার দূরে ঠেলে দিচ্ছে, সেখানে ডাক্তার,নার্স এবং ওয়ার্ডবয়রা কতটা ভালবাসা দেখাবে! সেই কারণে করোনা রোগীরা সঠিক সময়ে সঠিক সেবা পায় না। তখন আমি তাকে হাসপাতালে সেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার কথা বলি। তখন সে আমাকে বারণ করে। এরপর একদিন সে আমাকে কল দেয়, আমি গিয়ে দেখি সে চরম অসুস্থ,বমি করেছে অনেকবার। তখন আমি ভাবলাম পরিস্থিতি যতটা ভয়ংকরই হোক না কেন, মৃত্যুর ঝুঁকি থাকলেও কাউকে না কাউকে তো এগিয়ে আসতেই হবে। আর আমি যেহেতু কওমি মাদ্রাসার ছাত্র তাই আমার বিশ্বাস পৃথিবী উল্টে গেলেও আমার মৃত্যু যখন, যেখানে এবং যেভাবে লেখা আছে, ঠিক সেভাবেই হবে। তাহলে আমি কেন এই রোগীদের সেবা দিচ্ছি না? বাবা এবং মা’কে বললাম, তারা কিছুতেই রাজি হলো না। অনেক বোঝানোর পর বাবা-মা একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে যখন দেখলো আমাকে কিছুতেই তারা থামাতে পারছেন না, তখন তারা আমাকে বললেন তুমি যখন যেতেই চাও,তাহলে আর কি করা যাও, তবে সাবধানে থেকো। নিজের খেয়াল রেখো।

আব্দুস সামাদ: কুর্মিটোলা হাসপাতালে আপনি কী ধরনের কাজ করেন?

জুনায়েদ : আমি প্রায় মাসব্যাপী দিন-রাত একনাগারে করোনা রোগীদের সেবা করে যাচ্ছি। প্রতিদিন রাত ১২টায় হাসপাতালের ওয়ার্ডে গিয়ে দেখি নতুন রোগী কারা আসছে? তাদের কারও কিছু লাগবে কি-না? কারো অক্সিজেন লাগবে কি-না? নতুন কোনো রোগী এলে সে যদি বয়স্ক হয়, তার সাথে যদি কোনো লোক না থাকে তার মোবাইলে আমার নাম্বার সেভ করে দিয়ে বলে দেই যত রাতই হোক যে কোনো প্রয়োজনে আপনি আমাকে কল দিবেন। প্রায় প্রতিদিন রাতেই আমাকে কেউ না কেউ কল করে বলে তার অক্সিজেন শেষ, তখন আমি দ্রুত তার অক্সিজেন লাগিয়ে দেই। কারও গরম পানি লাগলে সাথে সাথে এনে দেই। অনেকের কাছে টাকা থাকে কিন্তু ফলমূল আনার লোক নাই। তাদের ফলমূল এনে দেই। যার যখন যেটা প্রয়োজন হয়,আমার সাধ্যের মধ্যে থাকা সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করি তার প্রয়োজন মিটানোর। সবচেয়ে বড় কথা যে কাজটা মহান আল্লাহ আমাকে দিয়ে করাচ্ছেন তা হলো: একজন করোনা আক্রান্ত রোগীকে আমি সর্বদা মানসিক সার্পোট দেয়ার চেষ্টা করি। যেন সে কোনোভাবেই আতঙ্কিত না হয় এবং নির্ভয়ে থেকে দিনাতিপাত করতে পারে।

আব্দুস সামাদ: আপনি এসকল কাজের জন্য কোনো পারিশ্রমিক পেয়েছেন বা পাচ্ছেন?

জুনায়েদ: নাহ! কোনো টাকা পয়সা ছাড়াই আমি নিজ থেকেই এই কাজ করছি, আমার এই কাজের প্রতিদান তো দেবেন মহান আল্লাহ। মানবিকতার দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে আমি এই কাজ করে যাচ্ছি। তবে যেহেতু করোনা আক্রান্ত ও মারা যাওয়া রোগীদের নিয়ে কাজ করবো, যার কারণে আমার বাহিরে যাওয়া ঠিক হবে না,তাই হাসপাতাল কতৃপক্ষকে বলেছিলাম আমাকে শুধু হাসপাতালে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমার এই প্রস্তাবে রাজি হয়েছে।

আব্দুস সামাদ: আপনি সবাইকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলতে চান?

জুনায়েদ: জ্বী! যারা করোনা রোগে আক্রান্ত হয়েছেন তাদেরকে আমরা কেহই যেন অবহেলা না করি। কারণ এটা একটা রোগ। এই রোগ যে কারোরই হতে পারে। যে আক্রান্ত হয়ে গেছে তাকে আমরা যেন সেবা যত্ন দিয়ে ভালো করে তুলি। কারণ সে ভালো হয়ে ওঠলে তার দেয়া প্লাজমা থেকে আপনার পরিবারের কেউ ভালো হয়ে ওঠতে পারে,ইনশাআল্লাহ।

এমন সময় আসবে মহামারী থাকবে না। হাসপাতালের বেড থেকে একটা লাশও নামাতে হবে না। একদিন কোনো করোনা আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর খবর মিলবে না ইনশাআল্লাহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares