প্রতিষ্ঠার চতুর্থ বছরে রক্তের বন্ধন যুব সংগঠন

স্টাফ রিপোর্টার:আসমা পারভিন টুম্পা

২০১৭ সালের ১৪ ই জুন বুধবার বিকেলে পিরোজপুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে একদল তরুণ মেধাবী ছাত্র ও যুব সমাজ নিয়ে রক্তের বন্ধন যুব সংগঠন প্রতিষ্ঠা হয়।


এই সংগঠন টির মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্য ছিল -রক্তের অভাবে ঝরে যেন না যায় একটি প্রাণ।

সেই লক্ষ্যে কাজ করে আসছে পিরোজপুরে দীর্ঘ তিনটি বছর ধরে।

যাতে সেবা পেয়েছে শত শত মানুষেরা।এবং পিরোজপুরে আস্থার একটি সংগঠন হয়ে ওঠে রক্তের বন্ধন যুব সংগঠন।।

এই সংগঠনের মাধ্যমে যারা ব্লাড গ্রহণ করে এবং দান করে তাদের একটি বিশেষ ফরমে নাম ঠিকানা ফোন নাম্বার ও রক্তের গ্রুপ এবং ব্লাড ডোনেট এর তারিখ লিখে রাখা হয়।

ডোনারদের দেওয়া হয় একটি রক্তদাতার কার্ড।

আর্থিক অস্বচ্ছলতা রোগির জন্য ব্লাড ব্যাগ ও ক্রোসম্যাস স্ক্যানিং বিনামূল্য করানোর চেষ্টা করে।

(মাসিক সমন্বয়ক সভা শেষে)

রক্ত বন্ধন যুব সংগঠনের সভাপতি – মোঃ ফরহাদ গাজির সাথে কথা বলে জানা যায়, যে তাদের সংগঠনের অন্তত ১০থেকে ১২ টি প্রজেক্ট রয়েছে।
যেমন:-
১।স্বেচ্ছায় রক্তদান।
২।থ্যালাসেমিয়া মুক্ত বাংলাদেশ গড়ি।
৩।বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয়।
৪।গর্ভকালীন মায়ের যত্ন নিয়ে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন।
৫।২৪ ঘণ্টা হেল্পলাইন।
৬।মানবতার দেয়াল।
৭।ভালোবাসার দোকান।
৮।জীবন বৃক্ষ।
৯।রক্তের বন্ধন গ্রন্থাগার।
১০।শীতকালীন বস্ত্র বিতরণ।
১১।বিভিন্ন বিষয়ে জনসচেতনতা মূলক ক্যাম্পেইন, লিফলেট বিতরণ,স্টিকার ও সাময়িকী বিতরণ।
১২।৬৪জেলা স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমের নিউজ এর জন্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল।

উপরোক্ত বিষয়গুলো নিয়ে আমরা কাজ করে থাকি,ইনশাল্লাহ ভবিষ্যতেও কাজ করব।

(স্বেচ্ছাসেবক দের এক অংশ)

এদিকে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহিন শেখ এর সাথে কথা বলে জানা যায় তিনি বলেন আমাদের সংগঠনের সদস্য ফরম পূরণকৃত সদস্য ৩০০শত+ তার সাথে ফরম পুরন ছাড়া প্রায় ৫০০শত সদস্য ;মোট ৮০০শত সদস্যঅধিক। নিয়ে আমরা মানবতার কল্যানে কাজ করে যাচ্ছি।

পরে এই সংগঠন দিয়ে সেবা পাওয়া একজন রোগির ছেলে মোঃ জাকারিয়ার কাছে লোমহর্ষক ঘটনা জানতে পারি।

দিনটি ছিলো ৩০ ডিসেম্বর ২০১৯,সোমবার, গভীর রাত মা ব্যাথায় ছটফট করতেছে আমার বোন আর আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম
পাশের ঘরের চাচিকে ডাক দিলাম।চাচি বললো শিগগির যা ধাইকে ঢেকে নিয়া আয়।ধাই ডাকা হলো মায়ের চিৎকার শুনে বোন খুব কান্না করতেছিলো।

অনেক সময় পেরিয়ে গেলো ফজরের আজান দিয়েছে তার কিছু সময় পর বাচ্চার কান্না শোনা গেলো চাচি এতে বললো তোদের ভাই হইছে বোন কান্না থামিয়ে হেসে উঠলো আমিও খুব খুশি।

আমি ভাইয়ের কানে আজান দিলাম। সকাল হলো সবার মুখে হাসি আমি ভাইয়ের নাম রাখলাম দ্বীন ইসলাম জারিফ।

মা ও ভালোই ছিলো কিন্তুু হঠাৎ মা আবার চিৎকার শুরু করলো মা জ্ঞান হারালো প্রতিবেশিরা বললো তারাতারি টলারের ব্যাবস্থা কর তোর মাকে হাসপাতালে নিতে হবে।

বাবা দৌড়ে গিয়ে টলার আনলো আমার কাছে টিউশনির ৩৮০০ টাকা ছিলো সেটা সাথে নিয়ে হাসপাতালের দিকে রওনা হলাম।

এতো প্রতিবেশি থাকা সত্বেও সাথে যেতে কেহ রাজি হলোনা তাই আমি,নানু আর একটা বন্ধু মিজান মা আর ভাইকে নিয়ে রওনা দিলাম।

মায়ের অবস্থা খুবই গুরুতর।
হঠাৎ করে শুরু হলো বৃষ্টি।
কোনো রকম ভিজে উপস্থিত হলাম নাজিরপুর সরকারি হাসপাতালে তখন সম্ভবত ১২ টা বাজে।

মাকে ভর্তি করানো হলো বাবা আব বন্ধু মিজান বাড়িতে রওনা হলো টাকা জোগারের জন্য।
সময় কেটে যাচ্ছে আমি নার্সদের কাছে বারবার ছুটে যাচ্ছি।
একটা নার্স এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলো তুমি কি করো?
আমি অনার্স ২য় বর্ষে পড়ি তারপর নার্স মাকে যা তা বলা শুরু করলো বললো এতোবড় ছেলে থাকতে আবার বাচ্চা নেয়া লাগবে কিসে এখন মরেন….. নার্সের ব্যাবহারে আমি খুবই কষ্ট পেলাম যাক সে কথা
নার্স বললো এখন ডাক্তার পাওয়া যাবেনা।আর তোমার মায়ের অবস্থা বেশি ভালোনা তাকে পিরোজপুর নিয়া যাও।

আর একটা ইন্জেকশন আনিয়ে মাকে দিলো তাতে মায়ের কষ্ট বোধহয় কিছুটা কমলো।

এখন আমি একা কি করবো??
একদিকে বৃদ্ধ নানি ছোট ভাই আর অসুস্থ মা।

ছোট ভাইকে নানির কোলে দিয়ে মাকে কোলে তুলে একটা গাড়িতে করে মাকে নিয়ে রওনা দিলাম পিরোজপুর। পিরোজপুর আমার কাছে নতুন যায়গা।
মাকে ভর্তি করালাম পিরোজপুর সদর হাসপাতালে।কয়েকটা টেষ্ট করানো হলো ডাক্তার বললো ৪ ব্যাগ AB+ রক্ত লাগবে।

আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো কিভাবে জোগাড় করবো ৪ ব্যাগ রক্ত।মেজো ভাই ঢাকায় ছিলো তাকে সব বললাম আর আমার ফোনে ১০০ টাকা ফ্লাক্সিলোড করে দিতে বললাম।
আত্বীয় স্বজন বন্ধুদের কাছে ফোন দিয়ে রক্ত লাগবে সেটা বললাম তারা বললো দেখতেছি কি করা যায়।

বৃষ্টিতে ভেজার কারনে ভাইটাকেও ভর্তি করানো হলো মা এক যায়গায় আর ভাই অন্য যায়গায়।

আমি ছুটোছুটি করতেছিলাম এখান থেকে ওখানে মন জুড়ে কষ্ট চোখ জুড়ে কান্না।মায়ের কাছে চোখ মুছে যাই কান্না করতে পারিনা অন্যত্র একটা যায়গায় বসে কান্না শুরু করলাম হাউমাউ করে। খুবই কষ্ট হচ্ছিলো আমার কান্না দেখে একটা নার্স আন্টি এসে আমাকে বলল কান্না করোনা ওখানে সংগঠনের নাম্বার দেয়া আছে তুমি তাদের কাছে কল করো তারা হয়তো কোনো ব্যাবস্থা করবে।

আমি দৌড়ে গিয়ে সংগঠনের নাম্বার তুলে তাদের কাছে কল করলাম তারা আমার মায়ের তথ্য নিলো এবং বল্লো দেখতেছি কি করা যায়। মা আর নানুর জন্য খাবার এনে তাদের খেতে দিলাম বাহির গিয়ে বসলাম এমন সময় একটা লোক এসে আমার কান্নার কারন জানতে চাইলে তাকে বলি সে বলে আমার ১ ব্যাগ রক্তের জন্য ১৯০০ টাকা খরচ হইছে রক্ত নিজেরা দিয়েছি তারপরও। একথা শুনে আমার কষ্ট আরও বেড়ে গেলো।আবার আত্বীয় স্বজনের কাছে কল করলাম তারা এক একজন এক একরকম কথা বললো তাদের কোনো রেসপন্স পেলাম না বন্ধুদের কাছে ফোন দিলাম তারা অনেকে বিরক্ত হলো ভাবলাম তাদের কাছে আর ফোন দিবোনা। যেখানে আত্বিয়স্বজন,বন্ধুরা সব মুখ ফিরিয়ে নিলো সেখানেতো আর কোনো আশাই রইলোনা তারমানে রক্তের অভাবে আমার মা মারা যাবে! এটা মনে উঠতেই কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে আমি কান্না শুরু করলাম মা ভাই কারো কাছেই গেলাম না কষ্ট হয় তাই। আশা যখন শেষ বুক ভরা কষ্ট নিয়ে বসে রইলাম এমন সময় একটা কল এলো আমার ফোনে কে করেছে জানিনা আমাকে জিজ্ঞেস করলো জাকারিয়া তুমি কই আমি কাঁদোকাঁদো হয়ে বললাম।কিছু সময় পর জন পাঁচেক লোক আমার কাছে আসলো বললো তুমি আমাদের কাছে ফোন দিয়েছিলে আমরা সংগঠনের লোক।
যখন আমার আশা শেষ তখন আশার আলো দেখালো তারা। তারা বললো চিন্তা করোনা দেখতেছি কি করা যায় তারা আমার কাদে হাত দিয়ে নানা কথা বলে আমাকে শক্ত করলো আমি ভেঙে পড়লে মাকে দেখবে কে ভাইকে দেখবে কে সত্যিই আমি তাদের কারনে আশা ফিরে পেলাম যখন আত্বীয় স্বজন বন্ধুরামুখ ফিরিয়ে নিলো ঠিক তখনই পাশে এসে দাড়ালো তারা।তারা আমাকে বললো তুমি তোমার ফেবু আইডিতে রক্ত চেয়ে একটা পোষ্ট করো আর আত্বীয়দের বলো তাদের রক্ত টেষ্ট করিয়ে রক্তের গ্রুপ জানতে। আমি তাই করলাম।তারা প্রান পনে চেষ্টা করতেছে সবাই কল করতেছে।ফরহাদ ভাই আমাকে দেখে বলল তুমি কিছু খাওনাই তাইনা আমি বললাম খেয়েছি কিন্তু আমি কিছু খাইনি সেটা তারা কিভাবে বুজলো বুজলাম না তারপর নাজমুল আর ফরহাদ ভাই আমাকে খাওয়ানোর জন্য নিয়ে গেলো আর তুফান ভাই সহ কাদেরকে যেনো পাঠালো আমার মাকে দেখতে। আমার খুবই লজ্জা করতেছিলো কেননা যেখানে তারা আমার উপকার করতে এসেছে সেখানে তারা আবার উল্টো আমাকে খাওয়াইতেছে। তারপর আবার হাসপাতালে ফিরলাম তাদের চেষ্টা দেখে একটু ভরশা পেলাম এমন সময় নানু আমাকে ডাক দিয়ে বললো তাদের সাথে কিসের কথা তাদের পিছনে কেনো ঘুরি তারা আমার সব টাকা নিয়া যাবে ইত্যাদি। আমি নানুর কথা মাথায় নিয়ে ভয়ে ভয়ে আবার তাদের কাছে গেলাম।
প্রায় তিন চার ঘন্টা চেষ্টা করার পর ইলিয়াস নামের এক ভাইকে পাওয়া গেলো যে রক্ত দিবে। যাক তবে তাদের চেষ্টায় ১ ব্যাগতো জোগাড় হলো তারা বললো তাদের সংগঠন কোনো টাকা নেয় না রক্তের জন্য না তারা কোনো ফলমুল নেয়না কিন্তু খরচতো আমাকেই দিতে হবে তারমানে সেই লোকটির বলা ১৯০০ টাকা আমার কাছে কিছু টাকা থাকায় মনে মনে বললাম এক ব্যাগতো আগে দেই।রক্ত টানা হলো এখন আমি বললাম এখানে কতো টাকা দিতে হবে ভাইয়া ফরহাদ ভাই বললো ৮৫০ টাকা ডায়গনস্টিক খরচ।আমি অবাক ১৯০০ এর বদলে ৮৫০ তাদের পেয়ে আমার এতো এতো সুবিধা হয়েছে যা বলে বুজাতে পারবোনা।রক্ত দেয়ার পড়ে আমার মা সুস্থের দিকে আসে,পরবর্তীতে আমি একজন রোগিকে রক্তদান করেছিলাম।

এ বিষয়ে কথা বলে সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক সজীব কুমার বলেন।সেবা পাওয়া জাকারিয়ার তার গল্পের মতো শত গল্প রয়েছে। তিনি আরো বলেন। আমাদের ১২জন নিয়মিত থ্যালেসেমিয়া রোগি আছে যারা হলো, মুনিয়া, মাইনুল, সাদমান,মিম,মহিমা,ফাইয়াজ, রাকিব, জুনায়েদ, রাকিব হাসান,আঃ বারেক,মানষ,জেসমিন,নিয়াজ, হালিম,প্রমুখ যাদের প্রতিমাসে ১ব্যগ করে রক্তদিতে হয়।

(থ্যালেসেমিয়া আক্রান্ত রাকিব)

সংগঠনের বর্তমান সম্বনায়ক জনাব মোঃনাজমুল বলেন আমাদের সংগঠনে প্রতিনিয়ত ১০-১২ টি রিকোয়েস্ট আসে কিন্তু করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহতায় অনেক ডোনার ঘরবন্দি হয়েছেন, কলেজ ছাত্ররা চলেগেছেন নিজ জেলায় তাই ডোনার সংকট পোহাতে হচ্ছে তারপরও মুমুর্ষ মানুষের পাশে রক্তদানে রক্তের বন্ধন একধাপ এগিয়ে আছে থাকবে ইনশাআল্লাহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares