অশ্লিলতাঃ সমাজ বিধ্বংসী এক সংক্রামক ব্যাধি ।। মোঃ আসিফ ইকবাল

 

লেখক:মোঃ আসিফ ইকবাল

 

করোনা ভাইরাস মহামারি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে । এ থেকে বেচে থাকার উপায় মোটামুটি  সবার ই জানা । যথাসম্ভব ঘরে থাকতে হবে , ভিরভাট্টা এড়িয়ে চলতে হবে , মাস্ক পড়তে হবে , গ্লবস পড়তে হবে , সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে ঘন ঘন । আর যে সব জায়গা থেকে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে সেখানে মনের ভুলে ও যাওয়া যাবে না । আমরা করোনা ভাইরাস কে ভয় পাই কারণ এটি জীবনের জন্য হুমকি স্বরূপ । বিশ্বে লাখ লাখ লোক মারা যাচ্ছে এই ভাইরাসে তাই আমরা যথাসম্ভব ঘরে থাকি এবং ভিরভাট্টার কাছে ও যাই না।

আমরা প্রান রক্ষাতে সচেষ্ট থাকলে ও আমরা কিন্তু মন রক্ষায় মোটে ও সচেতন নই আর তাই মন নষ্টকারি মহামারি থেকে বাচার কোন চেষ্টা ই আমাদের নাই । অথচ মন ছাড়া প্রানের কোন দাম নেই । সুন্দর ভাবে বেঁচে থেকে সুন্দর পৃথিবীর সৌন্দর্য  উপভোগ করার জন্য চাই সুন্দর একটা মন , অথচ আমরা জীবনকে উপভোগ করার নামে নিজের মন কে ধংস করে দিচ্ছি ।

আল্লাহ আমাদের উদ্দেশ্য করে বলেন ‘’ আর ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।‘’ [ সুরা বনী-ইসরাঈল ১৭:৩২ ]

এই করোনা মহামারির প্রেক্ষাপটে এই আয়াতের বাস্তবতা খুব ভাল বোঝা যায় । আপনি যদি এমন জায়গায় থাকেন যে আপনার আশেপাশে অনেক করোনা রুগী তাহলে আপনি ও করোনা থেকে বাচতে পারবেন না। ঠিক তেমনি অশ্লিল বিষয়াদির কাছাকাছি থাকলে আমরা এর থেকে বাচতে পারব না । জড়িয়ে ধরবে আমাদের  আষ্টেপৃষ্ঠে ।

এখন যদি প্রশ্ন করেন অশ্লিলতা আমাদের আশেপাশে থাকলে কিংবা আমরা নিজেরা ও যদি অশ্লিলতায় ডুবে থাকি তবে ক্ষতিটা কোথায় ? আমরা অশ্লিলতা থেকে বেচে না থাকলে কি আর এমন ক্ষতি হবে ? অশ্লিলতার প্রত্যেকটা বিষয় ই তো উপভোগ্য !

এর সোজা উত্তর হল আল্লাহ নিষেধ করেছেন তাই এসব করা যাবে না , কিন্তু আল্লাহ যেসকল বিষয় হারাম করেছেন তার সব গুলোর মধ্যে ই যুক্তিযুক্ত কারণ আছে , আর হারাম প্রত্যেকটা বিষয় ই  মানুষের জন্য ক্ষতিকর । আর এখানেই লুকিয়ে আছে ইসলামের সাস্বত ও চিরন্তন সত্য  হওয়ার প্রমান ।

তাহলে চলুন একটু খুজে দেখি অশ্লিলতা আমাদের কি কি ক্ষতি করে ।

অশ্লিল বিষয়াদি মানুষের মনে বা মস্তিস্কে যে সকল প্রভাব ফেলে তা বোঝার জন্য আপনাকে বিশাল মাপের বিজ্ঞানি বা গবেষক হতে হবে না । নিরপেক্ষ মন মস্তিস্ক নিয়ে চিন্তা গবেষনা করলে ই জানতে পারবেন  । অশ্লিল বিষয়াদি  উৎকাল্পনিক ইন্দ্রিয় সুখ দেওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যেরও অনেক ক্ষতি করে । মানসিক অবস্থার উপর বিভিন্ন ধরনের প্রভাব ফেলতে সক্ষম হরমোন নিঃসরণের পাশাপাশি আসক্তিমূলক প্রবণতাও সৃষ্টি করে ।  সকল অশ্লিল বিষয়াদির  মাধ্যমেই মস্তিষ্কে ডোপামিন ও অক্সিটোজিন নামের হরমোন নিঃসরিত হয়। এই হরমোনের প্রভাবেই আমাদের মস্তিষ্কে আনন্দের অনুভুতি বা ইন্দ্রিয় সুখানুভুতির সৃষ্টি হয়। আর এর কারনে ই সকল খারাপ বিষয় গুলোকে উপভোগ্য মনে হয় । কিন্তু সমস্যা হল আপনি এই সকল নিষিদ্ধ বিষয়ের মধ্যে ডুবে থাকলে বা এর আশেপাশে ঘোরা ফেরা করলে  স্বল্পবিরতিতে বারবার ডোপামিন নিঃসরণ হবে । ফলে মস্তিষ্ক এই হরমোনটির কার্যকারীতার প্রতি সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলবে ।আর এর ফলে আপনি আর আগের মত ছোটখা্ট বিষয়ে আনন্দ বা তৃপ্তি খুজে পাবেন না। পাশের বাসার পিচ্চিটার ফোকলা দাতের হাসি আপনার কাছে মুক্তদানার মত লাগবে না । কিংবা বৈশাখের দাবদাহের পর একপসলা বৃষ্টি আপনাকে স্বর্গীয় সুখ দিবে না । পৃথিবীর চিরন্তন বিষয় গুলো পানসে লাগতে শুরু করবে । চারিদিকে শুধু অশান্তি আর অশান্তি মনে হবে । শান্তির খোজে আপনি উন্মাদ হয়ে যাবেন । আর শেষে হতাশায় ভুগতে ভুগতে শান্তি খুজতে খুজিতে আবার সেই অশ্লিলতার দিকে ই ফিরে যাবেন , এভাবে আপনার জীবন একটা সার্কেলে আটকে যাবে । দৈনন্দিন কাজ ঠিকঠাক ভাবে করতে পারবেন না। এ দিক বিবেচনায় বলা যায় অশ্লিলতা একটা নেশা । আবার  নেশার সাথে ও অশ্লিলতার সম্পর্ক ও অত্যন্ত নিবির ।

মানুষ অশ্লিলতায় ভুগে ভুগে ই শেষে শান্তির খোজে নেশা করা শুরু করে , যদি ও নেশাগ্রস্থ হওয়ার ক্ষেত্রে কিছু ব্যাতিক্রম বিষয় ও আছে , কিন্তু এখানে নেশা মুল আলোচ্য বিষয় না তাই সেগুলো আর আলোচনা করা হল না।গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত অশ্লিল  ভিডিও দেখেন তাদের মস্তিষ্কের আকার ধীরে ধীরে সাধারণ পুরুষদের মস্তিষ্কের চেয়ে ছোট হয়ে যায়। জার্মান সাইকিয়াট্রি জার্নালে এক স্টাডির রিপোর্টে এ তথ্য জানানো হয়েছে।চিকিৎসকগণ তাদের সাধারণ পুরুষদের ব্রেনের সাথে অশ্লিল ছবি দেখে অভ্যস্ত পুরুষদের ব্রেনের তুলনা করে এমন রিপোর্ট প্রকাশ করেছেন।তাদের মতে, ষ্ট্রিয়াটোম নামের এক ধরণের সেনসিটিভ বিকল্প থিওরি অশ্লিলতার প্রতি   আসক্তি তৈরি করে। এটিই মূলত অশ্লিলতায়  আসক্ত ঐ সকল পুরুষদের ব্রেইন আকারে পরিবর্তন এনে থাকে।

বার্লিনের ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনিষ্টিটিউটের ড. সাইমন কোহন ও তার অনুসারী জার্মানির চারিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদল প্রায় ৬৪ জন সুস্থ সুঠাম দেহের পুরুষ যাদের বয়স ২১ থেকে ৪৫ এর মধ্যে, তাদের উপর গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে প্রাথমিক তথ্যে উপনীত হয়েছেন, তারা দেখতে পেয়েছেন, সুস্থ সুঠাম দেহের পুরুষদের ব্রেনের তুলনায় যারা অশ্লিলতায়  আসক্ত, তাদের ব্রেনের আকার ছোট হয়ে আসে।  ( সুত্র সময় নিউজ অনলাইন পোর্টাল ২৬-০৪-২০১৮, ১৮:১২)

তাহলে দেখা গেল অশ্লিলতা মানুষিক স্বাস্থের জন্য মারাত্নক ক্ষতিকর , অশ্লিলতা শুধু কি মানুষের স্বাস্থগত ক্ষতি করে ? তা নানা প্রকার সামাজিক অপবাধের জন্ম দেয় অশ্লিলতা । আগেই বলেছি অশ্লিলতার সাথে মাদকের নিবির সম্পর্ক রয়েছে , হয় মানুষ অশ্লিল কাজ করে হতাশায় ভুগে ক্ষনিকের সস্তির জন্য মাদক নেয় নয়ত মাদকাসক্ত হয়ে অশ্লিল কাজ করে ,

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ তারিখের মাদকের ভয়াভয় আগ্রাসন শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে জাতীয় দৈনিক প্ত্রিকা বাংলাদেশ প্রতিদিন । এতে মাদক নিয়ন্ত্রণ বোর্ড এর সদস্য  অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন মাদকাসক্তদের ৪৪ ভাগ ই  বিভিন্ন সন্ত্রাসী কাজে জড়িত । কিন্তু বাস্তবতা যে আরো ভয়াভহ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

বাংলাদেশ পুলিশের হিসাব মতে গত বছর ৫ হাজার ৪০০ নারী এবং ৮১৫টি শিশু ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়। ২০১৮ সালে শিশু ধর্ষণের মামলা ছিল ৭২৭টি এবং নারী ধর্ষণের মামলা ছিল ৩ হাজার ৯০০টি। পুলিশের হিসাব বলছে, গত বছর ধর্ষণের কারণে ১২ শিশু এবং ২৬ জন নারী মারা যান। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল ২১ নারী ও ১৪ শিশু।

আইন ও শালিস কেন্দ্রে তাদের ২০১৯ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, সারা দেশে ধর্ষণের ঘটনা আগের চেয়ে দ্বিগুণ বেড়েছে। গত বছর সারা দেশে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার ১ হাজার ৪১৩ নারী ও শিশু। ২০১৮ সালে সংখ্যাটি ছিল ৭৩২।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের মতে ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতি মাসে গড়ে ৮৪টি শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এ ছাড়া এক বছরে যৌন নির্যাতন বেড়েছে ৭০ শতাংশ। গত বছর যৌন নির্যাতনের শিকার হয় ১ হাজার ৩৮৩ শিশু। ২০১৮ সালের চেয়ে গত বছর শিশু ধর্ষণ ৭৬ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ বেড়েছে। (সুত্রঃ প্রথম আলো ২৭ জানুয়ারি ২০২০ অনলাইন সংস্করন )

এ গেল পরিসংখ্যান এর কথা কিন্তু  বাস্তবতা যে আরো অনেক ভয়বহ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না । এখানে আপত্তি তুলতে পারেন  করোণা ভাইরাসের কথা দিয়ে শুরু করে অশ্লিলতা আর মাদকের কথায় আসা পর্যন্ত মেনে নিয়েছি কিন্তু অশ্লিলতার সাথে ধর্ষন আর যৌন নিপীড়ন এর কথা টেনে আনাকে আর মেনে নিতে পারছি না। কিন্তু আমি আশা করি পুরোটা পড়লে আপনি আর আপত্তি তুলবেন না ।

আগেই বলেছি অশ্লিলতা একটা নেশা স্বরূপ , মানুষের মানুষিক স্বাস্থের জন্য মারাত্মক ক্ষত্তিকর , আর সোজা সাপটা ভাবে খোজ নিয়ে দেখলে দেখবেন অধিকাংশ ধর্ষক ই মানুষিক ভাবে বিকার গ্রস্থ ,এবং নারীদের প্রতি অবাস্তব এবং খুবই নোংরা চিন্তা ভাবনা লালন করে । আর এই নোংরা চিন্তা ভাবনার জন্ম দেয় অশ্লিলতা । হয়ত একটা ঘটনায় ধর্ষিতার কোন দোষ থাকে না , কিন্তু ঐ ধর্ষককে অন্যান্য দশ টা ঘটনা প্রোমট করে এই জঘন্য কাজে জন্য ।

ধর্ষনের সাথে অশ্লিলতার সম্পর্ক নিয়ে হাজার হাজার আর্টিকেল বা নিবন্ধ লেখা হয়। যার বেশিভাগ ই রচিত হয় মুদ্রার এক পিঠ নিয়ে । পুরুষের মানুষিকতাকে দোষ দেয়া হয় ,আবার আর একদল ঢালাও ভাবে নারীদের দোষ দেয় । আর এখানে ১ম দলের চেয়ে ২য় দল অধিকতর মুর্খতায় ডুবে আছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না

আমি ধর্ষনের কারন নিয়ে যত বিশ্লেষন পড়েছি তার মধ্যে দৈনিক যুগান্তরে ৭ এপ্রিল ২০১৮ তে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনকে উৎকৃষ্ট বলে মনে হয়েছে । আমি সেই প্রতিবেদনের চুম্বক অংশ তুলে ধরছি ।

 

‘’অবিশ্বাস্য ব্যাপার হলেও সত্য ১৩৮ বছর আগে রাশিয়ান বিজ্ঞানী পাভলভ এই ব্যাখ্যাটা দিয়ে গেছেন। বিজ্ঞানী পাভলভের এই কনসেপ্ট প্রত্যেক ডাক্তারকে তার মেডিকেল লাইফের সেকেন্ড ইয়ারে পড়তে হয়। সহজভাবে বলার চেষ্টা করি, নন-মেডিকেলদের জন্য দেখি বলতে পারি কিনা।বিজ্ঞানী পাভলভ একদল কুকুরকে ল্যাবে বেঁধে রেখে দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন। তিনি প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে তাদের খাবার দিতেন। কুকুরের সামনে থাকত খাবারের বাটি এবং আয়না। সেখানে পাভলভ কুকুরের আচরণ পর্যবেক্ষণ করতেন। প্রতিদিন ঠিক একই সময়গুলোতে কুকুরগুলোকে খাবার দেয়া হতো। পাভলভের সঙ্গে থাকতেন তার ল্যাব সহকারী। খাবার গ্রহণের সময় কুকুরের কী পরিমাণ লালা ঝরত সেটি একটি কন্টেইনারে মাপা হতো।ব্রেইনের স্বাভাবিক রিফ্লেক্স হলো খাবার গ্রহণের সময় লালা ঝরা। কিন্তু পাভলভ দেখলেন যে, খাবার গ্রহণ নয়, খাবার দেখেও এবার কুকুরের লালা ঝরতে শুরু করেছে। পাভলভ খাবার দেখে কুকুরের কী পরিমাণ লালা ঝরত সেটিও কন্টেইনারে মাপার ব্যবস্থা করলেন।বেশ কিছুদিন যাওয়ার পর পাভলভ দেখলেন তিনি ল্যাবে ঢুকলেই কুকুরের লালা বের হচ্ছে। সঙ্গে খাবার থাক আর না থাক।

পাভলভ এবার নিজে ল্যাবে না গিয়ে খাবারবিহীন অবস্থায় তার ল্যাব সহকারীকে ল্যাবে পাঠালেন। ল্যাব সহকারী অবাক হয়ে দেখলেন তাকে দেখেও (ল্যাব সহকারী) কুকুরের লালা ঝরছে। পাভলভ এবার ভিন্ন কিছু করলেন। তিনি কুকুরকে খাবার দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে একই সময়ে একটি ঘণ্টি বাজাতে থাকলেন। খাবার দেয়া হচ্ছে এবং ঘণ্টি বাজানো হচ্ছে।এরপর পাভলভ এবং সহকারী একদিন খাবার ছাড়াই ল্যাবে আসলেন এবং ঘণ্টি বাজাতে শুরু করলেন। দেখলেন খাবার না দেয়া সত্ত্বেও কুকুরগুলোর একই পরিমাণ লালা ক্ষরণ হচ্ছে।পাভলভ সিদ্ধান্তে আসলেন খাবারের প্যাকেট, ল্যাব অ্যাসিস্টেন্ট, ঘণ্টির শব্দ, এগুলো সব নিউট্রাল স্টিমুলেশন। এগুলোর সঙ্গে লালা ক্ষরণের সম্পর্ক নেই। কিন্তু কুকুর তার লার্নিং বিহেভিয়ারে খাবারের সঙ্গে খাবারের প্যাকেট, পাভলভ, ল্যাব সহকারী বা ঘণ্টার শব্দকে কো রিলেট করে ফেলেছে এবং খাবারের সঙ্গে যা যা ঘটে সব কিছুকেই লালা ক্ষরণের উপাদান হিসেবে তার ব্রেইন ডিটেক্ট করছে।

ব্রেইনের এই লার্নিং মেথডকে তিনি “কন্ডিশনিং” এবং “কন্ডিশন্ড রিফ্লেক্স” বলেছেন। অর্থাৎ ব্রেইন এমন একটি স্টিমুলেশনের প্রতি সাড়া দিচ্ছে, যেটিতে ব্রেইনের আদৌ রেস্পন্স করা উচিত না, কিন্তু করার কারণ হচ্ছে ব্রেইন এই স্টিমুলেশনকে আরেকটি স্টিমুলেশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে ফেলেছে।মানুষ কুকুর নয় যে, মেয়ে দেখলেই তাকে ধর্ষণ করবে।তবে মানুষের মধ্যে পশুত্ব আছে।

বিখ্যাত নিউরোলোজিস্ট এবং পরবর্তীতে সাইকিয়াট্রিস্ট ফ্রয়েড বলেছিলেন, যাকে আমরা মন বলি সেটি মূলত তিনটি সত্ত্বার সমন্বয়ে গঠিত – ইড, ইগো এবং সুপার ইগো।

অর্থাৎ মানব মন এই তিনটি গাঠনিক উপাদানে তৈরি –

“ইড” মূলত মানুষের জৈবিক সত্ত্বা।

মানব মনের স্বভাবজাত চাহিদা পূরণ করে ইড।

এটিকে “মন যা চায় তাই” এর সাথে তুলনা করা যায়।

“ইড” মানুষ এবং পশু সবার মাঝেই সমানভাবে বিরাজমান। এর কোন মানবিক দিক বা বিকাশ নেই। “ইড” এর পুরোটাই লোভ লালসা ও কাম চিন্তায় ভরপুর। “ইড” এমনভাবে মানুষকে প্ররোচিত করে যে, প্ররোচনায় মানুষ যে কোন অসামাজিক অপরাধ থেকে শুরু করে, খুন-ধর্ষণ পর্যন্ত করতে দ্বিধাবোধ করে না। এক কথায়, “ইড” হচ্ছে আমাদের ভিতরের সুপ্ত পশু।

সুপার ইগো হচ্ছে মানুষের বিবেক।

ইড যখন জৈবিক কামনা বাসনা পুরণ করতে উদ্দীপ্ত করে, তখন সুপার ইগো একে বাধা দেয়।

সুপার ইগো মানুষকে সব সময় মানবিক দুর্বলতার উর্ধে উঠে ভাল কাজ করার জন্য মানুষকে উদ্দপ্ত করে।

এই বাধা দেওয়ার ক্ষমতা নির্ভর করে ব্যক্তির নৈতিক, পারিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং সামাজিক শিক্ষা এবং মুল্যবোধের উপর।

অন্যদিকে ইগো হচ্ছে এই দুই অবস্থার মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টিকারী একটি অবস্থা।

ইড এবং সুপার ইগোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলাই এর কাজ।

ইড বলবে – I need to get it.

সুপার ইগো বলবে – You have no right to get it

ইগো বলবে – I need some plan to get it. অর্থাৎ ইগো ইডের ইচ্ছাটা বাস্তবায়ন করবে একটু ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে।

পশুরা ইড চালিত।

তাই তারা কেবল জৈবিক চাহিদা (খাবার এবং যৌনতা) পূরণেই ব্যস্ত। আবার মানুষের মধ্যে যখন “ইড” ডমিনেন্ট হয়ে যায়, তখন সে উন্মাদ ও অমানুষ হয়ে যায়। আর যখন কেবল সুপার ইগো কাজ করে – তখন সে সাধু সন্যাসী পবিত্র হয়ে যায়।ইগো এই দুই অবস্থার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে।

যেমন মানুষের মধ্যে যখন সুপার ইগো ডমিনেন্ট হয়, তখন অনেক সময় তাদের মধ্যে ডিপ্রেশন চলে আসে। ইগো তখন ব্যালেন্স করে। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা সুপার ইগোকে মানতে গিয়ে আমরা আমাদের বিভিন্ন চাহিদা পূরণ করতে পারি না। আমাদের এই অপূরণীয় চাহিদায় মন তখন বিক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। তখন বিক্ষিপ্ত মনকে শান্ত করতে ইগো কাজ করে।

জীব হিসেবে মানুষের সাথে অন্য প্রাণীর তেমন বেশি ডিফারেন্স নেই। উভয়েরই ইড আছে। কিন্তু মানুষের এর সাথে দুইটা জিনিস আছে ইগো এবং সুপার ইগো।

ইড, ইগো এবং সুপার ইগো র আপেক্ষিক তীব্রতা স্থিতিশীল নয়, বরং পারিপার্শিকতার সাথে পরিবর্তনশীল।

যেমন সুপার ইগো তথা বিবেক অসুস্থ হয়ে গেলে তখন সে তার কাজ অর্থাৎ অন্যায় কাজে বাধা দিতে পারে না।দেহের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে – খাবার না খেলে/পেটে খাবার না থাকলে ক্ষিদের অনুভূতি সৃষ্টি করে সেটি জানিয়ে দেওয়া। কিন্তু ক্রমাগত না খেয়ে থাকলে, দেহের দাবী অস্বীকার করলে দেহ অসুস্থ হয়ে যায় তখন সে স্বাভাবিক ক্ষিদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না।তেমনি সুপার ইগো তথা বিবেকের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে – সে খারাপ কাজে আপনাকে বাধা দিবে, কিন্তু যখন আপনি কন্টিনিউয়াসলি সুপার ইগোকে অস্বীকার করবেন, অমান্য করবেন – তখন এটি দুর্বল হয়ে যাবে এবং অন্যায় কাজে কার্যকর বাধা দিতে পারে না।

একজন মাদকাসক্ত প্রথম যে দিন মাদক সেবন করে, তখন “সুপার ইগো”র জন্য তার মধ্যে কিন্তু প্রচন্ড অনুশোচনাবোধ হয়। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে মাদক সেবন তার এই অনুশোচনা র তীব্রতা কমিয়ে দেয়।‘’

 

এখন একটা প্রশ্নের উত্তর দিন , আপনি ক্রমাগত দিনের পর দিন অশ্লিলতায় ডুবে থাকলে আপনার বিবেক বলে কি আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে?

না কখনো ই না, এ যাবতকাল ধরে করা সকল গবেষনা অন্তত এ কথা ই বলে , আর বিবেকহীণ মানুষ যেকোন কাজ ই করতে পারে । ধর্ষন তো তার কাছে মামুলি ব্যাপার । এখানে নারীর পোশাকের কোণ দোষ নেই , দোষ হল পুরুষের কাছে শিশুকাল থেকে নারীকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয় তার । যাই হোক অশ্লিলতা যে নারীকে শুধুমাত্র পুরুষের জন্য উপভোগ্য সামগ্রি হিসেবে উপস্থাপন করে যে বিষয়ে কারো কোন দিধাদন্দ থাকার কথা নয় । আর এ কারণে ই নষ্ট হচ্ছে পুরুষের মানুষিকতা ঘটছে এই সকল সামাজিক অপরাধ । অর্থাৎ এই মারাত্মক ব্যাধির পিছনে যে মুল হাতিয়ার অশ্লিলতা তা মোটামুটি প্রমানিত ।

স্বামী স্ত্রির সম্পর্ক এমন একটা বিষয় যা গোটা মানব জাতিকে পশুকুল থেকে আলাদা করেছে । একটা মানুষের সুস্থ স্বাভাবিক জীবনের জন্য একটা নিরাপদ আস্রয় স্থল দরকার যা তার পরিবার তাকে দেয় । আর পরিবারের মূল  একক হচ্ছে পতি এবং পত্নি । একটা কথা প্রচলিত  আছে এরকম যে নারীদের নিজের কোন ঘর নেই , শিশুকালে বাবার ঘরে , যৌবনে স্বামীর ঘরে আর বৃদ্ধবয়সে সন্তানের ঘরে । কিন্তু সব ঘর ই নারীদের ছাড়া অসম্পূর্ন । তার মানে একটা জীবনের পূর্নতা প্রাপ্তির জন্য একজন নারীর পূরুষ এবং একজন পুরুষের নারীর প্রয়োজন । আল্লাহ রব্বুল আলামিন মানবজাতিকে এভাবে ই সৃষ্টি করেছেন । তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের জন্য পোশাক স্বরূপ আর তোমরা তাদের পোশাক স্বরূপ। (” সুরা আল-বাক্বারাহঃ ১৮৭)

কিন্তু বর্তমানে বিবাহ বিচ্ছেদ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে । ২৭ আগষ্ট ২০১৮ তে প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয় ঢাকায় প্রতি ঘন্টায় একটি করে তালাকের আবেদন জমা পরে ।তালাকের আবেদন সবচেয়ে বেশি বেড়েছে উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায়-প্রায় ৭৫ শতাংশ। দক্ষিণ সিটিতে বেড়েছে ১৬ শতাংশ। দুই সিটিতে আপস হচ্ছে গড়ে ৫ শতাংশের কম। গত ছয় বছরে ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে অর্ধলাখের বেশি তালাকের আবেদন জমা পড়েছে। এ হিসাবে মাসে গড়ে ৭৩৬ টি, দিনে ২৪ টির বেশি এবং ঘণ্টায় একটি তালাকের আবেদন করা হচ্ছে। বর্তমানে বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে বেশি তালাক হয় (২ দশমিক ৭)। আর সবচেয়ে কম চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে (দশমিক ৬)।

ঐ প্রতিবেদনে আরো বলা  হয়  উত্তর সিটি করপোরেশনের গুলশান ও বনানীর অভিজাত পরিবারের শিক্ষিত ও বিত্তবান নারীরা বেশি তালাকের আবেদন করছেন। আবার দক্ষিণ সিটিতে মোহাম্মদপুর, কারওয়ান বাজার এলাকায় পেশাজীবী নারীরা বেশি তালাক দেন।

ঐ প্রতিবেদনে তালাকের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়  অন্য নারীর সঙ্গে স্বামীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, সামাজিক বন্ধনমুক্ত থাকার প্রবণতা। পরনারীর সঙ্গে সম্পর্ক, যৌতুক, , মাদকাসক্তি, ফেসবুকে আসক্তি, পুরুষত্বহীনতা, ব্যক্তিত্বের সংঘাত, নৈতিকতাসহ বিভিন্ন কারণ।

এখানে যেকারণ গুলো উল্লেখ করা হয়েছে যেগুলো সব ই অশ্লিল কাজ । আপনি যদি আপত্তি করেন তাহলে শুধু পুরুষত্বহীনতাকে নিয়ে করতে পারেন । কিন্তু গবেষনা বলছে যে কিশোর বয়স থেকে অশ্লিলতায় জড়িয়ে পড়লে মস্তিস্কের বিকৃতির পাশাপাশি টেষ্টোস্টেরন হরমোন উৎপাদন কমে যায় আশংকা জনক ভাবে ফলে পুরুষত্বহীনতা তৈরি করি ।

এখন কেউ প্রশ্ন তুলতে ই পারেন যে বিবাহ বিচ্ছেদ হলে আমার সমস্য কি , কেন এত বক বক করছি । আসলে আমি সমাজের নির্বাক আকুতি উপেক্ষা করে যেতে পারি না কারণ আমি নিজেকে সমাজের অংশ বলে দাবি করি ।

বিবাহ বিচ্ছেদ শুধু একটি পরিবারের ভাঙন সৃষ্টি করে না , রাস্তা তৈরি করে দেয় পতিতাবিত্তি , অবৈধ সম্পর্কের মত সামাজিক ব্যাধির অবাধে সমাজে ঘোরাফেরা করার । আর বিচ্ছেদ ডেকে আনে হতাশা , সেখান থেকে নেশা , নেশা থেকে মাদকাসক্ত , আর নেশাগ্রস্থ ব্যাক্তি যেকোন ধরনের অপরাধ ই করতে পারেন । ভেঙে যাওয়া পরিবার গুলো সন্তানরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ই অনাদর আর অবহেলায় বড় হয় , সঠিক সামাজিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয় , ফলে এদের একটা অংশ বড় হয়ে জড়িয়ে পরে নেশার ফাদে , আর সেখান থেকে জন্মনেয় আরো সমাজ বিধ্বংসী  উপাখ্যান ।

অশ্লিলতার সুদূর প্রসারি নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে আলোচনার পর আর কারো ই মনে প্রশ্ন থাকার কথা নয় যে কেন আল্লাহ তায়াল অশ্লিলতার কাছে যেতে ও নিষেধ করেছেন। তাই আমাদের উচিত অশ্লিলতা থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা । একবার অশ্লিলতায় সংক্রমিত হয়ে গেলে তা থেকে মুক্তি পাওয়া অনেক ক্ষেত্রে ই সম্ভব হয়ে ওঠে না । তাই আসুন আগামী দিনের জন্য  একটা সুন্দর পৃথিবী তৈরি করতে অশ্লিল সকল বিষয়কে প্রোমট করা বন্ধ করি এবং নিজ অবস্থান থেকে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলি ।

 

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares