কভিড-১৯ প্রেক্ষাপটে তরুন লেখক আসিফ ইকবালের রচিত গল্পঃ টিভি

 

সায়মা আন্টি । নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের হলে ও আশেপাশের লোকজনের কাছে একজন ভাল ,পরিশ্রমী , সৎ মানুষ হিসেবে পরিচিত । সবাই তাকে খুব ভালবাসে ।

কেউ কেউ আবার তার বিষয়ে একটা অভিযোগ করেন তিনি নাকি একটু বেশি জ্ঞান দিতে আসেন সব জায়গায়।

যাই হোক যারা এই অভিযোগ করেন তারা ও প্রায় সময় তার কাছে পরামর্শ নিতে আসেন ।

লকডাউনের শুরুর দিকের কথা। সায়মার বাড়ির পাশে করিমার ছেলের সুন্নাতে খতনার অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হইয়েছিল ।

আশে পাশের লোক দাওয়াত দেয়ার পাশাপাশি দূরের লোক ও দাওয়াত দেয়া হইয়েছিল ।

সাময়া করিমাকে ভালভাবে বুঝায় যে এখন দুনিয়ার অবস্থা ভাল না । অনেক লোক একত্রিত হলে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

কিন্তু করিমা বলে যে এই অনুষ্ঠান অনেক দিন আগের প্লান করা , অনেক লোক দাওয়াত দেয়া হয়েছে । এখন বন্ধ করা যাবে না।

করিমাকে কোন ভাবে রাজি করাতে না পারলে সায়মা তাকে বলে আসেন যে অনুষ্ঠান বন্ধ না করলে পুলিশ ডাকা হবে । পুলিশ ডেকে অনুষ্ঠান বন্ধ করা হবে ।

সন্ধায় সায়মা ৯৯৯ এ কল দিয়ে পুলিশ ডেকে আনলো । পুলিশ এসে করিমাদের বাড়ির অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিল।

এতে পাড়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। কেউ সায়মাকে দোষ দিল আর কেউ তার গুন কৃত্তন করতে লাগলো ।

কিন্তু সায়মার সাথে করিমার একটা বড় সড় ঝগরা বেধে গেল।

সায়মা বাড়ির আঙিনায় কিছু শাক সবজি চাষ করেছিল । সেই শাক সবজি কেনার জন্য পাশের গ্রামের লিয়াকত আসে একদিন বিকালে । করিমা লিয়াকতকে সায়মাদের বাড়িতে দেখে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে আর বলে আমার বাড়ির অনুষ্টান বন্ধ কর আর এখন নিজের বাড়ি অন্য গ্রামের লোক আনো কেন?এখন আর করোনার ভয় করে না?

সায়মা করিমার সাথে কোন দন্দ না করে চুপচাপ থাকলো ।

আস্তে আস্তে মহামারি ভাইরাস সারা দেশে ছড়িয়ে গেল । সামাজিক সংক্রমনের পর্যায়ে পৌছাল ভাইরাস। প্রতিদিন শত শত লোক আক্রান্ত হতে শুরু করলো এই ভাইরাসে।
সায়মা সহ এলাকাবাসি খুবই চিন্তিত । সায়মা এলাকা বাসিকে সাধ্য মত সচেতনা করার চেষ্টা করেন। আর নিজে ও সচেতন থাকেন।

তিনি প্রতিদিন রাতে বিভিন্ন স্যাটালাইট চ্যানেলে অনুষ্ঠিত টকশো দেখেন । সাস্থবিধির নতুন নতুন তথ্য জানেন আর আশে পাশের মানুষকে তা জানান।

সায়মা আশে পাশে সবাইকে ফোন করে নিয়মিত লেবুর রস আর কাচা আম খেতে বলেন কারন এতে ভিটামিন সি আছে । সবাই সায়মার কথা শুনে চলে। কেউ প্রয়োজন ছাড়া আর ঘরের বাইরে যায় না ।

এর ই মধ্য দেখা দিল বিপত্তি । করিমার ছোট ছেলের জ্বর কাশ দেখা দিল । পুলিশ এসে তাদের বাড়ি পুরোপুরি লকডাউন করে দিয়ে গেল । করিমার পরিবারের কেউ আর ঘরের বাইরে বেড়াতে পারলো না। আর আশেপাশে লোকজন ও কেউ তাদের খোজখবর নিতে যায় না।

দুই একদিনের মধ্যে ই তাদের খাবার ফুরিয়ে গেল । তাদের কষ্টের আর শেষ রইলো না। চার পাচ দিন পরে করিমার ছেলের করোনা নেগিটিভ আসলো ।

কিন্তু কেউ তাদের আশেপাশে ও যেতে চাইল না। এই অবস্থায় সায়মা নিজ উদ্দোগে করিমাদের জন্য কিছু চালডাল আর প্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে আসলো ।

করিমা নিজের ভুল বুঝতে পারলো । নিজের ভুলের জন্য সায়মার কাছে লজ্জিত হল।

ভাইরাস সায়মার এলাকার আশেপাশের এলাকায় ব্যপক ভাবে ছড়িয়ে পড়ল ।

কিন্তু সায়মার কথামত তাদের এলাকার লোকজন স্বাস্থবিধি মেনে চলায় তাদের এলাকা এখন ও নিরাপদ ।

কিন্তু কয়েকদিন হল সায়মা এলাকা বাসির খোজখবর নিতে পারেন না। দুই-একজন তার কাছে ফোন করে মহামারির আপডেট জানতে চয়। কিন্তু সে কিভাবে তাদের খবর দিবে , কিভাবে পরামর্শ দিবে ।

তার বহু পুরাতন টিভি টি নষ্ট হয়ে গেছে । তাই সে নতুন নতুন তথ্য পাচ্ছে না ।

আজকাল সবার হাতে হাতে স্মার্ট ফোন থাকলে ও তা দিয়ে দরকারি কাজের চেয়ে অদরকারি কাজ ই বেশি হয়। সায়মার মন খুব খারাপ। লকডাউন তাই টিভি সার্ভিসিং এর দোকান ও বন্ধ ।

সন্ধার সময় সায়মা বসে আছে ঘরের মধ্য । তার ঘর থেকে টকশো উপস্থাপক খান মুহাম্মদ রুমেল , মুজাদিন শুভ কিংবা গোলাম রাব্বি বা খবর পাঠক ফয়সাল মোরসেদের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না ।

হটাৎ দরজায় খট খট আওয়াজ । ঘরের ভিতর থেকে আসতে একটু দেরি হল ।সায়মা দরজা খুলে দেখল দরজার বাইরে একটা টিভি রাখা । আর একটা চিরকুট ।

চিরকুটে লেখা ছিল “ কাকি লকডাউন শেষ হলে আপনার টিভিটি সার্ভিসিং করিয়ে আমার টা ফেরত দিয়েন। আর প্রতিদিন আমাদের ফোন করে মহামারি আপডেট দিতে ভুইলেন না। ‘’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares